গণভবনে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের সঙ্গে বৈঠক

খালেদা জিয়ার প্রস্তাব অবাস্তব:প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৫৫
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকার গঠন নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়ার দেয়া প্রস্তাবকে অবাস্তব হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, আমি জানি না তিনি কিসের ভিত্তিতে এ ধরনের নির্বাচনকালীন সরকারের প্রস্তাব দিলেন। কারণ যাদের নাম তিনি প্রস্তাব করেছেন, তাদের অনেকে মারা গেছেন, কেউ কেউ অসুস্থ, আবার অনেকে অপরাগতাও প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, অনেক চড়াই উত্রাই পেরিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম। এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় গণভবনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় ১৪ দলীয় জোট নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বৈঠকে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রীর সর্বদলীয় অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাবের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে ১৪ দল। তবে ওই সর্বদলীয় সরকারে জামায়াতসহ কোনো স্বাধীনতাবিরোধী বা উগ্রসাম্প্রদায়িক দলকে মেনে নেবে না শরিক দলের নেতারা। একইসঙ্গে জোটের শীর্ষ নেতারা বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়ার প্রস্তাবকে ‘অসাংবিধানিক’ আখ্যায়িত করে তা জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যানের দাবি জানান। সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিএনপি আলোচনার জন্য আন্তরিক নয় বলেই সংসদে এসে প্রস্তাব দিয়ে তারা চলে গেলেন। আমরা আলোচনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম, আহ্বানও জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারা শুধু বলে গেলেন, শোনার সময় তাদের হলো না। মনে হয় তারা আলোচনায় রাজি না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে তা রাষ্ট্রপতিকে জানাব। আমি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে এই কথা বলেছিলাম। প্রসঙ্গত, গত সোমবার সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে প্রধানমন্ত্রীর সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব নাকচ করে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকারের পাল্টা প্রস্তাব দেন খালেদা জিয়া। গতকাল সন্ধ্যায় সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নির্বাচনকালীন সরকারের প্রস্তাব উত্থাপন করার কিছু সময় পর পঞ্চম সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত সরকার দলীয় এক সংসদ সদস্যের বক্তব্যের প্রতিবাদে ওয়াক আউট করে বিএনপি। সূত্র জানায়, বৈঠকে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও ন্যাপের এনামুল হক বক্তব্য রাখেন। তারা সকলেই নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এর চেয়ে উত্তম প্রস্তাব আর হতে পারে না। তারা বিরোধী দলকে এ প্রস্তাব মেনে নির্বাচনে আসার অনুরোধ জানান। ১৪ দল ও মহাজোটগতভাবে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে নেতৃবৃন্দ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এ সময় জোটের নেতারা সরকারের মেয়াদে অবমূল্যায়নের বিষয় উল্লেখ করে আগে থেকেই আসনবন্টনের বিষয়টি চূড়ান্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানান। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবার সাথে আলোচনা করে যথাসময়ে আসন বন্টন করা হবে। আওয়ামী লীগ প্রার্থী বাছাই করার জন্য ইতিমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে। আপনারাও কাকে মনোনয়ন দেবেন তা ঠিক করুন। পরে আলোচনার মাধ্যমে সিট ভাগাভাগি করা হবে। এ সময় তিনি নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান। বৈঠকে সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, বিএনপি নির্বাচনে আসবে বলে মনে হয় না। কারণ তারা নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চায়। বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম সাংবাদিকদের বলেন, সম্প্রতি জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন যে সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তাকে স্বাগত জানিয়েছে ১৪ দল। ১৪ দল মনে করে, এই ভাষণের মধ্য দিয়ে দেশে বিদ্যমান সমস্যার সমাধানের পথ রয়েছে। তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠন হবে। আর সকল দলের অংশগ্রহণে এ নির্বাচনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপের যে সূচনা শুরু করেছেন বিএনপি তাতে অংশ নেবে বলে ১৪ দল আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। বৈঠকে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে ১৪ দল ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়ার দেয়া নির্বাচনকালীন সরকারের প্রস্তাব গ্রহযোগ্য নয় বলে ১৪ দল মনে করে। নির্বাচন বাধা সৃষ্টির যে কোন অশুভ চক্রান্ত রুখে দেয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন ১৪ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দ। রাত ৯টায় শুরু হওয়া বৈঠক চলে পৌনে ১১টা পর্যন্ত। পরে প্রধানমন্ত্রী জোটের নেতাদের নৈশভোজে আপ্যায়িত করেন। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে আওয়ামী লীগের ১৫ জন নেতাসহ অন্যান্য দলের ৩৬ জন নেতা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে সংসদ উপনেতা ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন এমপি, আনিসুর রহমান মল্লিক, ফজলে হোসেন বাদশা, বিমল বিশ্বাস, জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, মাঈন উদ্দিন খান বাদল, শিরিন আক্তার, সাম্যবাদী দলের দিলীপ বড়ুয়া, লুত্ফর রহমান, ধীরেন সিংহ, গণতন্ত্রী পার্টির নুরুর রহমান সেলিম, শহীদুল্লাহ শিকদার, ন্যাপের আব্দুর রহমান, এনামুল হক, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টির মো. জাকির হোসেন, গণআজাদী লীগের হাজী আব্দুস সামাদ, এস.কে শিকদার, কমিউনিস্ট কেন্দ্রের ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান, অসিত বরণ রায় প্রমুখ। সর্বদলীয় অন্তর্বর্তী সরকার গঠন এবং আগামী নির্বাচনের সম্ভাব্য দিনক্ষণ চূড়ান্ত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকের অংশ হিসেবে দ্বিতীয় দফায় বুধবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আদর্শিক জোট ১৪ দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। এর আগে প্রথম দফায় তিনি জাতীয় পার্টির (এ) সঙ্গে বৈঠক করেছেন।