লড়াইয়ে ফেরালেন মমিনুল-তামিম

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০১৩, ২২:২৭
দুটো গালি, দুটো শর্ট কাভার, পয়েন্ট, শর্ট পয়েন্ট, মিড অফ; অফ সাইডে তিরিশ গজের মধ্যেই সাতজন ফিল্ডারকে দাঁড় করিয়ে ফেললেন ব্রেন্ডন ম্যাককালাম। এবার দুপাশ থেকে নিল ওয়াগনার ও ট্রেন্ট বোল্ট অফ স্ট্যাম্পের বাইরে বল করে যেতে থাকলেন। অফে একটা শটও ফিল্ডারদের ফাঁক গলে বের হওয়ার উপায় নেই। ব্যাটসম্যানও অফেই রান করার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাতে থাকলেন! বিকাল বেলা ব্যাট-বলের এই লড়াই স্নায়ুর চাপ বাড়িয়ে দিল, দর্শক দুই পায়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ম্যাকগ্রা হতে পারলেন না বোল্ট বা ওয়াগনার। বোলার ওয়াগনারের মাথার ওপর দিয়ে চার মেরে দিলেন মোমিনুল হক; উল্লাসে ফেটে পড়ল স্টেডিয়াম। না, মোমিনুলের এই চারে বাংলাদেশ ম্যাচ জিতে যায়নি। শুধু ৯৯ রানে দাঁড়িয়ে চাপের মধ্যে পড়ে যাওয়া মোমিনুল এই শট দিয়ে নিজের সেঞ্চুরিটা পেলেন। দর্শকের উল্লাস আপাতত হয়তো সেই সেঞ্চুরির কারণে ছিল। তবে তার চেয়ে উল্লাসের বড় উপলক্ষ আরেকবার সেই মোমিনুলের ব্যাটে ভর করে লড়াইতে অন্তত ফেরার পথে আছে বাংলাদেশ। এই মোমিনুলের অপরাজিত ১২৬ রানের ইনিংস ও তামিম ইকবালের স্বভাববিরোধী ৭০ রানের ইনিংসে ভর করে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চলতি ঢাকা টেস্টের কাল চতুর্থ দিন শেষে ৩ উইকেটে ২৬৯ রান তুলেছে বাংলাদেশ। এখন পর্যন্ত ম্যাচে ১১৪ রানে এগিয়ে মুশফিকুর রহিমের দল। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ২৮২ রানের জবাবে ৪৩৭ রান তুলে ১৫৫ রানের লিড নিয়েছিল নিউজিল্যান্ড। ৮ উইকেটে ৪১৯ রান নিয়ে গতকাল চতুর্থ দিনের খেলা শুরু করেছিল নিউজিল্যান্ড। আগের দিনই অস্বাভাবিকভাবে লিড বেড়ে যাওয়ার পর গতকাল আর নিউজিল্যান্ডের লেজ ছাঁটতে সময় নেয়নি বাংলাদেশ। স্কোর বোর্ডে আর ১৮ রান যোগ হতে ফিরে যান নিউজিল্যান্ডের বাকি দুই ব্যাটসম্যান। বিজে ওয়াটলিং একদিকে ৭০ রানে অপরাজিত থাকলেও ইশ সোধি রান আউট হয়ে ফেরেন ৫৮ রান করে। আর ব্যক্তিগত ৪ রানে শেষ ব্যাটসম্যান হিসাবে রাজ্জাকের দ্বিতীয় শিকার হয়ে ফেরেন ট্রেন্ট বোল্ট। বাংলাদেশের শুরুটা ভালোই হয়েছিল। টানা তিন ইনিংস ধরে ব্যর্থ হতে থাকা এনামুল হক বিজয় অবশেষে রানের দেখা পাচ্ছিলেন। একেবারে উল্টো চরিত্র ব্যাট করতে থাকা তামিম ইকবালের সঙ্গে উদ্বোধনী জুটিতে ৩৯ রান যোগ করে ফেলেছিলেন। কিন্তু ২৬ বলে ৪টি চারে সাজানো এনামুলের ২২ রানের ইনিংসের অপমৃত্যু হল ওয়াগনারের অফ স্ট্যাম্পের বাইরের একটা বলে অহেতুক কাট করতে চাওয়ায়; ফুলটনকে ক্যাচ দিয়ে ফিরলেন তিনি। চার ওভার পর ওই ওয়াগনারের বলেই মার্শাল আইয়ুব যখন ফিরে এলেন, তখন দর্শকদের মনের এক কোণে ইনিংস পরাজয়ের শঙ্কাও দুলতে শুরু করেছে। আগের তিন ইনিংসে দারুণ পরিণত ব্যাট করা মার্শাল ৯ রানে ফিরে এলে শঙ্কাটা তো থাকেই। কিন্তু এই শঙ্কা দূর করতেই শুরু হল তামিম ইকবাল ও মোমিনুল হকের স্ববিরোধী মহাকাব্যিক লড়াই! তামিম সারাটা জীবন মারকুটে ব্যাটিংয়ের জন্য পরিচিত। আর মোমিনুল একটু শান্তভাবেই শুরুটা অন্তত করেন। কাল এই দুজন উল্টো চরিত্র দেখিয়েই রুখে দাঁড়ালেন। দারুণ শান্ত তামিম আর আক্রমণাত্মক ইনফর্ম মোমিনুল মিলে বাংলাদেশকে লড়াইয়ের পথ দেখাতে শুরু করলেন। তৃতীয় উইকেটে ১৫৭ রানের অসাধারণ এক প্রতিরোধ গড়ে মোমিনুল ও তামিম ভেঙ্গে দিলেন ১০ বছরের পুরনো এই উইকেটের বাংলাদেশ রেকর্ড। ২০০৩ সালে করা আশরাফুল ও জাভেদ ওমরের করা ১৩০ রানের জুটিকে টপকে গেলেন তামিম-মোমিনুল। এই জুটিতে তামিম কতোটা স্বভাববিরোধী খেলেছেন, তা পরিসংখ্যানই সাক্ষ্য দেবে। ১৫৭ রানের এই জুটিতে তামিমের অবদান মাত্র ৫০ রান; মোমিনুল একাই যোগ করেছেন ১০৩ এবং ৪ এসেছে অতিরিক্ত থেকে! শেষ পর্যন্ত একেবারেই বিপরীত চেহারায় খেলতে থাকা তামিম ৭০ রানে কেন উইলিয়ামসনের বলে আউট হয়ে ফেরার ভেতর দিয়ে শেষ হল এই জুটির। কেমন ছিল সেই ৭০ রানের ইনিংস? গুনে গুনে ২১৮টি বল খেলেছেন তামিম এই দারুণ ধৈর্যের পরিচয় দেয়া ইনিংসে। পুরো ইনিংসে মাত্র ৪টি চার মেরেছেন তামিম। কিন্তু এত ধৈর্যের ফল হিসাবেও আরাধ্য সেঞ্চুরিটা পেলেন না প্রথম ইনিংসে ৯৫ রানে আউট হওয়া তামিম। সে আফসোস অবশ্য মোমিনুলের নেই। বিস্ময়কর ফর্মে থাকা এই তরুণ ব্যাটসম্যান সিরিজে নিজের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন। বাংলাদেশে তামিম ইকবালের পর মাত্র দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসাবে সেঞ্চুরি করেছেন। এছাড়া এক সিরিজে সর্বোচ্চ রান ও সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড বাংলাদেশের পক্ষে এখন তার। এমন নতুন নতুন সব রেকর্ডে সাজানো ১২৬ রানের ইনিংস খেলে অপরাজিতই আছেন মোমিনুল। আরেকটি বড় ইনিংসের পথে চলা এই দুর্দান্ত ইনিংস খেলতে এ পর্যন্ত ২২৫টি বল মোকাবেলা করেছেন; মেরেছেন ১৬টি চার। এরই মধ্যে সাকিবের সঙ্গে ৫৭ রানের জুটি করে তামিমের বিদায়ে তৈরি হওয়া শঙ্কাও দূর করে ফেলেছেন মোমিনুল। এখন অপেক্ষা আজকের লড়াইয়ের।