‘আই অ্যাম মালালা’

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০১৩, ২২:২৮
আমার যখন জন্ম, তখন খুব গরিবি হালে কাটত আমাদের। আমার আব্বু আর তার এক বন্ধু মিলে প্রথম স্কুল করলেন আমাদের এলাকায়। সেই স্কুলের উল্টোদিকে আমাদের ছোট্ট দুই রুমের একটা বাসা। আমি ঘুমাতাম বাবা-মায়ের সঙ্গে। অন্য ঘরটা অতিথিদের জন্য বরাদ্দ থাকত। নিজেদের বাথরুম, রান্নাঘর বলে কিছু ছিল না। আম্মু মেঝেতে লাকড়ি দিয়ে রান্না-বান্না করতেন। স্কুলের পানির কলটাতেই চলত কাপড়-চোপড় ধোয়া। আমাদের বাড়িতে প্রায়ই অতিথিদের ভিড় লেগে থাকত। গ্রাম থেকে লোকজন আসত। পশতুন সমাজে আতিথিয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার জন্মের দুই বছর পর এল আমার ভাই খুশল। আমার মত তারও জন্ম হল বাড়িতে, হাসপাতালে নয়। খুশল খান খাত্তাক ছিলেন পশতুন কবি ও বীর। তার নামেই আমার ভাইয়ের নাম খুশল রাখলেন আব্বু। আমার আম্মুর দীর্ঘ দিনের আকাঙ্খা, তার একটা পুত্র সন্তান হবে। সেই ইচ্ছে পূরণ হওয়াতে আমার আম্মু কী খুশি, কী খুশি! আমার মনে হল, খুশল বড়ই দুর্বল। আকৃতিও খুব ছোট। মনে হত, যেন ক্ষীণ লতা, জোর হাওয়া লাগলেই পড়ে যাবে! কিন্তু সে তো আমার মায়ের চোখের মনি, বুকের ধন ‘লাডলা!’ আমার মনে হত, আমার ভাইয়ের যে কোন ইচ্ছেই যেন আমার মায়ের কাছে আদেশ! খুশল কেবলই চা খেতে চাইত। পশতুনদের চা মানে হল, দুধের সঙ্গে চা, চিনি আর এলাচি। আম্মুও সেভাবেই চা বানাতেন। কিন্তু খুশলের সারাক্ষণ চা খাওয়ার অভ্যাস দূর করতে আম্মু এমনভাবে চা বানাতেন যেন তা তেতো লাগে। যাতে খুশল আর চা খেতে না চায়। আমার জন্মের পর এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে কাঠ দিয়ে বানানো একটা পুরানো দোলনা চেয়ে এনে তাতে আমাকে রাখা হত। নতুন দোলনা কেনার মত পয়সা ছিল না আব্বুর। আম্মু চাইলেন, খুশলের জন্য নতুন দোলনা কেনা হোক কিন্তু আব্বু রাজি হলেন না। বললেন, ‘মালালা যদি পুরানো দোলনাতেই বড় হতে পারে তবে খুশলও তাই হবে! এর প্রায় পাঁচ বছর পর আম্মুর আরো একটা ছেলে হল। তার নাম রাখা হল আতাল। দারুণ উজ্জ্বল দুটো চোখ, কাঠবিড়ালির মত সারাক্ষণ চঞ্চল। আতালের জন্মের পর আব্বু বললেন, আমাদের তিন সন্তান হল—আর নয়। সোয়াতের ছোট পরিবার হিসাবে এটা যথেষ্ট। বলা ভালো, সোয়াতে অধিকাংশ দম্পতিরই সাত-আট জন করে সন্তান। খুশল আমার চেয়ে মাত্র দুই বছরের ছোট, তাই তার সঙ্গেই আমি খেলাধুলা বেশি করতাম। আবার ঝগড়া-ঝাটি, মারামারিটাও তার সঙ্গে হত বেশি। কিছু ঘটলে সে নালিশ করতে দৌড়ে যেত মায়ের কাছে, আমি যেতাম আব্বুর কাছে। বাবা জিজ্ঞেস করতেন, ‘কি হয়েছে জনি?’ আমার মা দেখতে খুবই সুন্দর। আব্বু তার সঙ্গে এমন ব্যবহার করতেন, যেন মা একটা চীনা মাটির পুতুল, একটু নাড়া লাগলেই ভেঙ্গে যাবে! আমি কখনো আব্বুকে আম্মুর কাঁধে হাত দিতেও দেখিনি। আমার আম্মুর নাম তর পেকাই। কথাটার মানে হল ‘কুচকুচে কালো কুঞ্চিত কেশদাম’। যদিও তার চুল পুরোপুরি কালো ছিল না—খানিকটা লালচে বাদামি। আমার আম্মুর যখন জন্ম হয় তখন আমার নানা জানসের খান আফগান রেডিওতে এই নামটা শুনে নিজের কন্যার নাম রাখেন। আমার মায়ের গায়ের রঙ শ্বেত পদ্মের মত, চোখ সবুজ, কী সুন্দর তার গড়ন! ভাবতাম, আমার গায়ের রঙও কেন আম্মুর মত হল না! উল্টো আমার নাক থ্যাবড়া, বাদামি চোখ—ঠিক আব্বুর মত। আমাদের সমাজে সবারই একটা করে ডাক নাম থাকে। কিন্তু আমার অনেকগুলো। আমার ছোটবেলা থেকেই মা আমাকে ডাকেন ‘পিশো’ বলে। চাচাতো ভাইয়েরা আমাকে ডাকে ‘লাচি’ নামে। পশতুন ভাষায় ‘লাচি’ কথাটার অর্থ এলাচি। আমাদের সমাজে নাম নিয়ে মজা করার একটা ব্যাপার আছে। যেমন কেউ বেটে হলে লোকে তাকে ডাকবে লম্বু, আবার লম্বা হলে তাকে ডাকবে বেটে বলে। কালো লোককে ফর্সা, ফর্সা লোককে কালো—এমনি মসকরা করার একটা ব্যাপার আমাদের সমাজে বেশ জনপ্রিয়। আমার আব্বুকে লোকে ডাকে, ‘খায়েস্তা দাদা’। কথাটার অর্থ সুন্দর পুরুষ!