অবশেষে চালু হলো নেত্রকোনা জেলাবাসীসহ সুনামগঞ্জ হাওর অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর বহুল প্রত্যাশিত আন্তঃনগর ট্রেন ‘হাওর এক্সপ্রেস’। ক’দিন আগে রাতে ঐ আন্তঃনগর ট্রেনে দেশের বাড়িতে গিয়েছিলাম। ট্রেনটির প্রথম শ্রেণির কেবিনে ভ্রমণকালে নিরাপত্তাহীনতার যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছে তা তুলে ধরতেই এ লেখা।
দিনের বেলায় প্রথম শ্রেণির কেবিনের টিকেট মূল্য ২৭৫ টাকা যা রাতে হয়ে যায় ৪৬০ টাকা— প্রায় দ্বিগুণ। কারণ রাতে প্রথম শ্রেণির প্রতিটি কেবিন শ্লিপিং বার্থ-এ পরিণত হয়। অর্থাত্ একটি সম্পূর্ণ সিট নিয়ে ঘুমিয়ে যাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিজনকে একটি বালিশ ও একটি চাদর দেওয়া হয়। সে হিসেবে ওপর-নিচ করে একটি কেবিনে বিপরীত দিকে দুটো করে মোট ৪টি সিট রয়েছে।
আমরা দু’জন যাত্রী। রাত ১১টা ৫০ মিনিটে কমলাপুর স্টেশনে উল্লিখিত ট্রেনে প্রথম শ্রেণির সংশ্লিষ্ট কেবিনে আরোহণ করি। বিমানবন্দর স্টেশনে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত টিটি একজন যাত্রীকে আমাদের বিপরীত দিকের ওপরের সিটটি অর্থাত্ লাগেজ রাখার স্থানটি দেখিয়ে দিলেন। ঐ যাত্রী প্রদর্শিত ওপরের সিটে উঠে শুয়ে পড়েন। বাকি রইলো নিচের অবশিষ্ট সিটটি। আর কোনো যাত্রী নেই ভেবে আমরা কেবিনের দরজা আটকিয়ে লাইট অফ্ করে ঘুমানোর চেষ্টা করি।
মধ্যরাতে ট্রেনটি জয়দেবপুর স্টেশন অতিক্রম করার পরপরই কেবিনের দরজায় ধাক্কা। দরজা খুলে দিতেই চার-পাঁচ জনের একটি দল কেবিনে প্রবেশ করে। তাদের সকলের বয়স ২৫-৩০ এর মধ্যে। তাদের আচরণ ও দৈহিক ভাষা সুবিধেজনক ছিল না। তাদের সঙ্গে ট্রেনের কর্তব্যরত (অনুমান) ABC লোগোযুক্ত ইউনিফর্ম পরা কয়েকজন লোকও প্রবেশ করে। সম্ভবত তারা বেসরকারি কোনো সংস্থা কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত। তবে তাদের কী কাজ আমরা জানতে পারিনি।
শ্লিপিং বার্থ কেবিনে কেন এত লোক ঢোকানো হলো তা জানতে চাওয়ায় প্রবেশকারী ঐসব ব্যক্তি উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করতে শুরু করে। ট্রেনে কর্তব্যরত (?) ঐসব ব্যক্তি যারা ইউনিফর্ম পরা তারা এদের আচরণে নীরব থাকে। যা থেকে বোঝা গেছে— তাদের ঘুষ নিয়ে ঢোকানো হয়েছে। এ পর্যায়ে চতুর্থ সিটের কোনো টিকেট আছে কিনা জানতে চাইলে ইউনিফর্মধারী ব্যক্তিদের মদদে অনুপ্রবেশকারীরা চড়াও হাওয়ার মতো আচরণ করতে থাকে। সেইসঙ্গে অকথ্য ভাষায় গালাগাল শুরু করে। তাদের আচরণে তাদেরকে প্রকৃতিস্থ মনে হয়নি।
এরূপ পরিস্থিতিতে উপস্থিত কর্তব্যরত ব্যক্তিরা নীরব দর্শকের ভূমিকাই পালন করেনি, তারা নীরব সমর্থকের ভূমিকাতেও অবতীর্ণ হয়। এ অবস্থায় নিরাপত্তামূলক সামান্যতম কোনো ব্যবস্থা পরিলক্ষিত হলো না। বরং কর্তব্যরত ব্যক্তিরা উলটো আমাদের শাসাতে থাকে। তাত্ক্ষণিক মানসিক দৃঢ়তায় ঐসব উচ্ছৃঙ্খল ও মাতাল ব্যক্তিকে মোকাবেলার চেষ্টা করি। আমাদের জিরো অবস্থানের কারণে ওদের মধ্য থেকে একজন ছাড়া অন্যরা কেবিন ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু তাদের আচরণের ফলে এই গভীর রাতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় বাকি রাত পার করতে হয়। এক কথায় বলা যায় যে, কোনো স্বাভাবিক ভদ্র যাত্রী এই পরিবেশে ভ্রমণ করতে পারে না।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভীতিকর ঘটনার জন্য ট্রেনের কর্তব্যরত উল্লিখিত ইউনিফর্মধারী ব্যক্তিরাই দায়ী বলে মনে করি— যারা ওদের কেবিনে ঢোকার সুযোগ করে দিয়েছে। নইলে প্রতিকার না করে কেন ওদের পক্ষ অবলম্বন করলো? অবশ্য ফিরতি পথে এদের একজন (যিনি নিজেকে সুপারভাইজার বলে পরিচয় দিলেন) আমাদের কাছে এসে (মনে হলো ঘটনার পর থেকে তাঁরা আমাদের অব্যাহত অনুসন্ধান করেছেন) ঐদিনের ঘটনায় তাঁদের অক্ষমতা প্রকাশ করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। প্রথম শ্রেণির এসব কেবিন উঠিয়ে দিয়ে অন্য শ্রেণির বগির মতো উন্নতমানের চেয়ারযুক্ত বগি করা যেতে পারে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে ভেবে দেখতে অনুরোধ করছি।
হাওর এক্সপ্রেস ট্রেনটি খুবই জনপ্রিয় একটি বাহনে পরিণত হচ্ছে। প্রচুর সংখ্যক সাধারণ মানুষ এতে ভ্রমণ করতে শুরু করেছে। যেহেতু ট্রেনটি মধ্যরাতে ঢাকা থেকে ছেড়ে যায় এবং যেহেতু এই লাইনে ডাকাতিসহ নানান অঘটনের নজির রয়েছে, সেহেতু নিরাপত্তার বিষয়টির প্রতি আরো নজর দিতে হবে। প্রথম শ্রেণির কেবিনগুলো যেভাবে তৈরি তাতে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকলে যে কোনো সময় যে কোনো রকমের অঘটন ঘটতে পারে।
নেত্রকোনা
