বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক চিত্র যুগে যুগে বদলাইয়াছে। যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেই পরিবর্তন মানবজাতির জন্য সুখের হয় নাই। একেক সময় একেক পরাশক্তির উদ্ভব ঘটিয়াছে, তাহারা এই পৃথিবীর মানচিত্র বদলাইয়াছে নিজেদের খেয়ালখুশি মতো। বিগত প্রায় সাত দশক ধরিয়া একটি বৃহত্ পরাশক্তিধর দেশ একরকম টার্গেট করিয়াই একটির পর একটি দেশে যুদ্ধ চাপাইয়া দিয়াছে। নিজেদের পছন্দের সরকার বসাইতে গোয়েন্দা বাহিনী দিয়া সামরিক অভ্যুত্থান ঘটাইয়াছে দেশে দেশে। বিশেষ বাহিনীর মাধ্যমে চালাইয়াছে গোপন অভিযান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হইতে সারাবিশ্বে এইভাবেই আধিপত্য কায়েম করিয়াছে এই বৃহত্ পরাশক্তি। এই তথ্য জানাইয়াছে ‘গ্লোবাল রিসার্চ : সেন্টার ফর রিসার্চ অন গ্লোবালাইজেশন’ নামের একটি খ্যাতনামা সংস্থা। তাহাদের প্রকাশিত এক গবেষণা রিপোর্টে বলা হইয়াছে যে, গত ৭৩ বত্সরে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার লঙ্ঘন ও হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে প্রায় তিন কোটি বেসামরিক নিরীহ মানুষ প্রাণ হারাইয়াছে। ইহা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত মানুষের প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাত্ দেখা যাইতেছে বিশ্বযুদ্ধের মতো ঘোষিত পরিবেশ পরিস্থিতি না থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধের কারণেই প্রাণ হারাইয়াছে দুইটি বিশ্বযুদ্ধের সমসংখ্যক নিরীহ মানুষ! যুদ্ধে প্রত্যেক নিহত ব্যক্তির বিপরীতে অন্তত ১০ জন আহত হইয়া থাকে। সেই হিসাবে গত সাত দশকে আরও অন্তত ২০ হইতে ৩০ কোটি মানুষ আহত হইয়াছে। কয়েক বত্সর ধরিয়া এই গবেষণা করিয়া রিপোর্টটি প্রস্তুত করিয়াছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ জেমস এ লুকাস।
লুকাসের তৈরি রিপোর্টটিতে এত স্পষ্ট করিয়া নানান তথ্য-উপাত্ত সংযোজন হইবার আগেও বিশ্বব্যাপী শান্তিকামী বিশ্লেষকরা বহুবার বিশ্লেষণ করিয়া দেখাইয়াছেন পরাশক্তির বিচিত্র কৌশলী আগ্রাসনের চিত্র। সর্বশেষ ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর নূতন করিয়া বিস্তৃত হইয়াছে তথাকথিত সন্ত্রাস-বিরোধী যুদ্ধ। দেশে দেশে এই যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবেই নিহত হইয়াছে অন্তত দশ লক্ষাধিক মানুষ। বিকলাঙ্গ মানুষের ইয়ত্তা নেই। নিজেদের আগ্রাসন অটুট রাখিতে সমৃদ্ধ জনপদসমূহে কথিত গণতন্ত্র রফতানি করিবার অজুহাতেও ছিন্নভিন্ন করা হইয়াছে। সমৃদ্ধ এইসকল দেশের উন্নত জীবনের অধিকারী নাগরিকদের শরণার্থী বানাইয়া সৃষ্টি করা হইয়াছে নূতন সংকট। অথচ স্বস্তিদায়ক বিশ্বের স্বার্থে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গঠন করা হইয়াছিল জাতিসংঘ। কথা ছিল সেইখানে উন্নত-অনুন্নত—সকল রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরাই কথা বলিতে পারিবে; কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদ গঠন করিয়া নষ্ট করা হইয়াছে জাতিসংঘের মূলশক্তিকে। যাহার ফলে জাতিসংঘকে পাশ কাটাইয়াই নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত লইতে দ্বিধা করে না পরাশক্তিসম্পন্ন রাষ্ট্র। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির মধ্যে খারাপ সম্পর্ক টিকাইয়া রাখা ও তাহাকে সময়মতো ব্যবহার করাও পরাশক্তি রাষ্ট্রটির আগ্রাসন নীতির এক বড় দিক।
বিশ্ব নূতন করিয়া ক্রমশ পরিবর্তিত হইতেছে। সুতরাং পরাশক্তিধরদের উচিত সবার আগে নিজেদের ঘর সামলানো। সাত সাগর তের নদী পার হইয়া আসিয়া অন্য দেশের ব্যাপারে তাহাদের নাক গলানো বন্ধ করিবার সময় আসিয়াছে।
