পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অর্থনৈতিক কুফল

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০১৩, ২২:১৯
ইসরায়েল কেমন করিয়া ফিলিস্তিনকে ধ্বংস করিয়া দেওয়ার চেষ্টা-চরিত্র করিয়া চলিয়াছে তাহার সর্বশেষ প্রমাণটি দিয়াছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির সদ্য-প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন হইতে জানা যাইতেছে যে পশ্চিম তীরে দুই-তৃতীয়াংশ ভূমির উপরে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব কায়েম থাকিবার পরিণতিতে ধুঁকিতে থাকা ফিলিস্তিনি অর্থনীতির যাবতীয় সম্ভাবনা অতি দ্রুত নস্যাত্ হইয়া যাইতেছে। এমন অবস্থা চলিতে থাকিলে আর কিছু দিনের মধ্যে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গটি বলিতে গেলে এক ধরনের অপাঙক্তেয় আলোচনায় পর্যসবিত হইয়া যাইতে পারে বলিয়া আশঙ্কা করা হইতেছে। পশ্চিম তীর এবং গাজা লইয়া ফিলিস্তিন গঠিত। ইহার মধ্যে গাজার আয়তন নিতান্ত ক্ষুদ্র; সাড়ে তিনশত বর্গ কিলোমিটারের সামান্য অধিক। এই কারণে ফিলিস্তিনের মূল ভূখণ্ড বলিতে বস্তুত সাড়ে পাঁচ হাজার বর্গ কিলোমিটারের কিছু অধিক আয়তনসম্পন্ন পশ্চিম তীরকেই বুঝায়। ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তির অধীনে পশ্চিম তীর ‘এরিয়া এ’, ‘ এরিয়া বি’ এবং ‘ এরিয়া সি’ অংশে বিভক্ত। আর ‘এরিয়া সি’ হইতেছে পশ্চিম তীরের দুই-তৃতীয়াংশ। এই এলাকাতেই রহিয়াছে ফিলিস্তিনের যাবতীয় খনিজ সম্পদ, চাষের জন্য উর্বরা ভূমি, বসতের উপযোগী জমি, সুপেয় জলের উত্স এবং পর্যটক আকর্ষণকারী পত্নতাত্মিক নিদর্শনসমূহ। অথচ ‘এরিয়া সি’ এর নিয়ন্ত্রণে রহিয়াছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। এইখানেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করিয়া বসতি নির্মাণ করিয়া চলিয়াছে ইসরায়েল। এই এলাকাতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ কিংবা বেসরকারি বিনিয়োগের সকল সম্ভাবনা নষ্ট হইয়া যাইতেছে ইসরায়েলের বিদ্বেষমূলক আচরণ ও উদ্দেশ্যমূলক অসহযোগিতার কারণে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবমতে সম্ভাবনাময় উত্সগুলি বিনা-ঝামেলাতে ব্যবহার করিতে সক্ষম হইলে বত্সরে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের মত বাড়তি আয় করিতে পারিবে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ। ইহার ফলে গড় মাথাপিছু আয় বাড়িবে এক-তৃতীয়াংশ, কমিয়া আসিবে উদ্বেগপূর্ণ হইয়া উঠা বাজেট ঘাটতি, বাড়িবে কর্মসংস্থান। ইহা ছাড়াও ‘এরিয়া সি’ এর যথাযথ ব্যবহার সম্ভব হইলে দারিদ্র্য, খাদ্য অনিশ্চয়তা ও বিদেশী অনুদান নির্ভরতাও কমিয়া আসিবে। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি উন্নতির তেমন কোন আলামত দেখা যাইতেছে না। ইসরায়েলি অনমনীয়তার মুখে নিরুপায় ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ ‘এরিয়া সি’ বাদ রাখিয়া বলিতে গেলে সহায়-সম্পদহীন অন্য দুইটি এলাকা ব্যবহার করিয়া উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করিতে চাহিতেছে। স্বাভাবিকভাবেই ইহাতে কাজের কাজ তেমন কিছু হইতেছে না। কিছুদিন পূর্বে পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি স্থাপনের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থার ঘোষণা দিয়াছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। কিন্তু প্রধান শক্তি যুক্তরাষ্ট্র না নড়িলে যে তেমন কোন কাজ হইবে না তাহা বুঝিতে কাহারও অসুবিধা হয় না। বারাক ওবামার দ্বিতীয় আমলে তাহার ফরেন সেক্রেটারি জন কেরি নূতন করিয়া ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ‘শান্তি আলোচনা’ শুরু করিবার তোড়জোড় করিতেছেন। কিন্তু মার্কিন উদ্যোগের মধ্যে ‘এরিয়া সি’ লইয়া তেমন কোন বিশেষ বক্তব্য একেবারেই নজরে আসে না। ‘এরিয়া সি’তে অবৈধ কর্মকাণ্ড হইতে ইসরায়েলকে বিরত রাখিতে যুক্তরাষ্ট্রকে তেমন কোন উদ্যোগ লইতেও দেখা যাইতেছে না। বরং শান্তি না আসিবার জন্য উভয় পক্ষকেই দায়ী করিবার এক নীতি অবলম্বন করিতেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন ইহার ক্ষতিকর দিকটি স্পষ্ট করিয়া দিয়াছে। এবং নূতন করিয়া স্মরণ করাইয়া দিয়াছে যে অবৈধ দখলদারিত্বের অবসান না ঘটিলে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দূরে থাকুক, অর্থনৈতিকভাবে টিকিয়া থাকাটাই ফিলিস্তিনের জন্য কঠিন হইয়া পড়িবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন