দুই নেত্রীর ফোন-আলাপ

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০১৩, ২২:২৮
প্রধানমন্ত্রী ফোনে বিরোধী দলীয় নেত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন, আসুন আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করি প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেত্রীর প্রতি দেশ ও জাতির স্বার্থে হরতাল প্রত্যাহারের আহবান জানান বিরোধী দলীয় নেত্রী বলেন, ১৮ দলীয় জোটের নেতাদের একত্রিত করে এখন এই কর্মসূচি প্রত্যাহার করা অসম্ভব আগামী জাতীয় নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান এবং দেশবাসীর নানা শঙ্কা-উদ্বেগের মধ্যেই গতকাল শনিবার ফোনে কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া। প্রধানমন্ত্রী তাকে আগামীকাল সোমবার সন্ধ্যায় তার সরকারি বাসভবন গণভবনে আলোচনা ও নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। একইসঙ্গে দেশ ও জাতির স্বার্থে হরতাল কর্মসূচি প্রত্যাহারের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তবে বিরোধী দলীয় নেতা প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হলে সকল কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হবে। এর আগে আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া টানা ৬০ ঘণ্টার হরতাল প্রত্যাহার করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ এই হরতালের কর্মসূচির সিদ্ধান্ত তার একার নয়, এটি ১৮ দলের জোটগত সিদ্ধান্ত। ২৯ অক্টোবরের পর আলোচনার জন্য যে কোনদিন গণভবনে যেতে প্রস্তুত বলে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়ে দেন। গতকাল সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে বসে বিরোধী দলীয় নেতাকে নিজ মোবাইল থেকে ফোন করেন। এসময় তার সঙ্গে গণভবনে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমদ, এইচ টি ইমাম, ড. মশিউর রহমান, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ। খালেদা জিয়া তার গুলশানের বাসায় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কল রিসিভ করেন এবং কথা বলেন। পরে দুই নেত্রীর আলোচনা সম্পর্কে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। অন্যদিকে, বিএনপি চেয়ারপারসনের পক্ষে তার গুলশানের কার্যালয়ে প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেল অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের তাত্ক্ষণিক ব্রিফ করেন । সৈয়দ আশরাফ জানান, বাংলাদেশের ইতিহাসে আজ একটি যুগান্তকারী ঘটনা ঘটলো। প্রধানমন্ত্রী স্ব-উদ্যোগে বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে ৩৭ মিনিট কথা বলেছেন। এসময় তিনি আগামীকাল ২৮ অক্টোবর গণভবনে তাকে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, যে কোনো বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করতে পারি। আসুন, আমরা একসঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করি। খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনি যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন তা আমি পেয়েছি। ওইদিন আপনি আসুন, আমি আপনাকে আমার সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নেয়ারও আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ আপনার দলের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে আসবেন। যতজন খুশি আসতে পারেন। কতজন আসবেন, আগে একটা তালিকা দিলে ভালো হবে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, আমাদের প্রত্যাশা-দুই নেত্রী আলোচনায় বসে বিরাজমান সমস্যার সমাধান করবেন, সকল জটিলতার অবসান হবে। খালেদা জিয়া শুক্রবারের জনসভায় বলেছেন, শনিবারের মধ্যে আলোচনার উদ্যোগ নেয়া না হলে হরতাল করবেন। তার দেয়া সময়ের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তাকে ফোন করে আলোচনার আহ্বান জানালেন। কাজেই এখন হরতালের আর প্রয়োজন নেই। আমরা আশা করছি প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানের পর বিএনপি নেত্রী হরতাল প্রত্যাহার করে নেবেন। এক প্রশ্নের জবাবে সৈয়দ আশরাফ বলেন, আমরা আশা করি খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ গ্রহণ করবেন। সোমবার তিনি গণভবনে আসলে আলোচনার শুরুতে দুই নেত্রী ওয়ান-টু-ওয়ান আলোচনা করতে পারেন। সেই সূচনা আলোচনা হবে গুরুত্বপূর্ণ। এরপর দুই দলের টিম বসে আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তবে প্রধানমন্ত্রী যে কোন বিষয়েই আলোচনার জন্য প্রস্তুত। আর এক প্রশ্নের জবাবে আশরাফ জানান, জামায়াতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। জানা গেছে, ফোনে আলাপের শুরুতে খালেদা জিয়াকে শেখ হাসিনা বলেছেন, দুপুরেও কয়েক দফা আমি আপনাকে রেড টেলিফোনে কল করেছি। কিন্তু আপনাকে পাইনি। এসময় বিরোধী দলীয় নেতা তাকে জানান, রেড টেলিফোনটি ডেড ছিল। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ফোনটি ডেড ছিল নাকি ডেড করে রাখা হয়েছিল, তা আমি আগামীকাল দেখবো। এদিকে, খালেদা জিয়ার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেল সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে বিরোধী দলীয় নেতা বলেছেন, হরতালের পর যে কোনদিন আমরা গণভবনে আসবো। খালেদা জিয়া বলেন, নির্দলীয় সরকারের দাবি আজ গণদাবিতে পরিণত হয়েছে। এই দাবির প্রতি যদি আপনি নীতিগতভাবে সম্মত হন তাহলেই কেবল হরতাল অবরোধ তুলে দিয়ে আলোচনায় বসতে রাজী। আপনার সিদ্ধান্ত জানলে আমরা আর হরতাল-অবরোধ করব না। এক টেবিলে নির্বাচনকে কীভাবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করা সম্ভব তা নিয়ে আলোচনা করব। ১৮ দলের হরতাল কর্মসূচির বিষয়ে খালেদা জিয়া বলেন, আপনি যদি গতকালও (শুক্রবার) আমাকে ফোন করতেন। আশ্বাস দিতেন তাহলে কর্মসূচি প্রত্যাহারের বিষয়ে আমি জোট নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতাম। কারণ এই হরতালের সিদ্ধান্ত আমি একা নেইনি। আজকে (শনিবার) হরতালের আগের রাত ১৮ দলীয় জোট নেতাদেরকে পুলিশ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তারা আত্মগোপনে আছেন। এখনই তাদের একত্রিত করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব নয়। তাই ২৯ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টায় হরতাল কর্মসূচি শেষে যে কোনো সময় আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানালে প্রয়োজনীয় লোকদের নিয়ে যেতে প্রস্তুত আছি। এখন আর সময় নেই। এজন্য এবারের এই হরতাল কর্মসূচির পরেই আলোচনা শুরু করা সম্ভব হবে। সোহেল জানান, প্রধানমন্ত্রী অতীতের অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। এসবের উত্তর দিয়ে খালেদা জিয়া একথা বার বার জোর দিয়ে বলেছেন, আমরা অতীতের ভুল বোঝাবুঝি ও তিক্ততার অবসান ঘটিয়ে নতুন ধারার রাজনীতি করতে চাই। অতীত নিয়ে থাকলে আমরা সামনে এগুতে পারবো না। বর্তমানের দাবি হচ্ছে জনগণের সমস্যা নিরসন করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।তিনি বলেন, আপনি যদি আন্তরিকভাবে কথা বলতে চাইতেন দিনে বা গতকালই অনেক মাধ্যমে তা সম্ভব ছিলো। এটা ঠিক হয়নি। ফোন করার আগে আপনার স্টাফরা এসে ফোন সচল ছিলো কি না তা দেখেযেতে পারতো। খালেদা জিয়া বলেন, আপনি ও আমি দুটি প্রস্তাব দিয়েছি। সে দুটিকে সমন্বয় করে আলোচনা করে নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠার জায়গায় পৌঁছাতে পারবো। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে সন্ধ্যা ৬টা থেকে বাড়িতেই ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিরোধী দলীয় নেতার একান্ত সচিব সালেহ আহমদ ও বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেল। কথা বলার পর বিএনপি জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংলাপের উদ্যোগ নিতে আওয়ামী লীগকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠালে তাকে ফোন করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এরপর শুক্রবার সকালে এক অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রী যে কোনো সময় টেলিফোন করবেন বিরোধী নেত্রীকে। গতকাল সকালে এক অনুষ্ঠানে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও জানান, বিকেলে প্রধানমন্ত্রী বিএনপি নেত্রীকে ফোন করতে পারেন। এসব ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই অবশেষে দুই নেত্রী টেলিফোনে কথা বলেন।