আমার বয়স যখন বছর চারেক, তখন আব্বুকে বলতাম, ‘আবা, তোমার গায়ের কি রঙ?’ আব্বু বলতেন, ‘ঠিক জানিনে। একটু ফর্সা, একটু কালো।’ আমি বলতাম, ‘চায়ের সঙ্গে দুধ মেশালে যেমন?’ আব্বু শুনে খুব হাসতেন। তবে এই কালো রঙটা নিয়ে অন্য পুরুষের মতো তার মনেও একটা খেদ হয়তো ছিল। আগে নাকি মাঠে গিয়ে মোষের দুধ এনে মুখে লাগাতেন—একটু ফর্সা হওয়ার আশায়। পরে যখন আমার আম্মুর সঙ্গে তার দেখা হলো, তার পর নাকি রঙ নিয়ে তার মনের খেদ আর ছিল না। সেই কালো রঙ নিয়েই তার মনে একটা আস্থার ভাব তৈরি হলো। তিনি ভাবতে লাগলেন, এত সুন্দরি একজন যখন তাকে পছন্দ করেছে, তাহলে তার রঙটা নেহাত খারাপ কিছু নয়!
আমাদের সমাজে বিয়েটা হয় সাধারণত দুই পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। তবে দুইজন দুইজনকে পছন্দের মাধ্যমে হলেও বিয়ের ঘটনা একেবারে কম নয়! আমি শুনেছি, আমার আব্বু লেখা-পড়া করতে গিয়েছিলেন সোয়াতের উত্তরাঞ্চলে- শাংলা গ্রামে। আব্বু থাকতেন তার চাচার বাড়ি। তার পাশের বাড়িটাই ছিল আমার আম্মুর খালার। হঠাত্ একদিন দেখা হতেই দুইজনকে পছন্দ হয় দুইজনের; কিন্তু পছন্দ করা যত সহজ, আমাদের সমাজে সে কথা বলা ততটা সহজ নয়। আব্বু একটা কবিতা লিখে পাঠালেন আমার আম্মুর কাছে; কিন্তু আম্মু তো পড়তে জানতেন না!
সমস্যাটা হলো, আমার দাদা বা নানা কেউই ব্যাপারটা জানতেন না। তাই আব্বু যখন তার পছন্দের পাত্রী তোর পেকাইকে বিয়ে করার ইচ্ছের কথাটা জানালেন, তখন কোন পক্ষই তাতে তেমন খুশি হলো না। তবে শেষপর্যন্ত আমার দাদা একজন নাপিতকে ঘটক করে কনে পক্ষের কাছে পাঠাতে রাজি হলেন। এটাই আমাদের সমাজের রীতি; কিন্তু আমার নানা মালিক জানসের খান সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন। আমার আব্বু নাছোড়বান্দা টাইপের মানুষ। তার বাবাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আবার সেই নাপিতকে ঘটক করে পাঠাতে রাজি করালেন। নানা জানসের খানের বাড়ি ‘হুজরা’ ছিল এক বড় আড্ডখানা। লোকজন দিনরাত সেখানে গিয়ে রাজনীতি নিয়ে আলাপ আলোচনা করত। আমার আব্বুও যাওয়া শুরু করলেন সেখানে। আব্বুর সঙ্গে আমার নানার চেনা-জানা হলো। শেষপর্যন্ত এই বিয়েতে রাজিও হলেন নানা; কিন্তু ততদিনে পেরিয়ে গেছে নয়টি মাস।
আমার আম্মু খুবই প্রভাবশালী পরিবারের মেয়ে। তাদের পরিবরে পুরুষরা যেমন প্রভাবশালী, নারীরাও তেমনি সাহসী। আমার আম্মুর দাদা যখন মারা যান তখন তার দাদির বয়স অনেক কম। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে খুবই সমস্যায় পড়েছিলেন তিনি। তার বড় ছেলে অর্থাত্ আমার নানা জানসের খানের বয়স তখন মাত্র ৯; কিন্তু সেই বয়সেই এক প্রতিবেশী গোত্রের সঙ্গে কোন্দলের কারণে তাকে জেলে যেতে হয়। আমার আম্মুর দাদি একাকী চল্লিশ মাইল পাহাড়ি পথ পেরিয়ে তার এক প্রভাবশালী জ্ঞাতি ভাইয়ের কাছে যেতেন তাকে ছাড়িয়ে আনার জন্য। আমাদের পরিবারে আম্মুর অবস্থানটাও ছিল মজবুত। আম্মুর মত না নিয়ে আব্বু বড় কোন সিদ্ধান্ত নিতেন না। আব্বু সারা দিন যা যা করেন, তা আম্মুকে এসে বলেন; কিন্তু আমাদের সমাজে এটা নিয়ম বিরুদ্ধ। অধিকাংশ পুরুষই স্ত্রীর পরামর্শ শোনাকে কাপুরুষতা বলে মনে করে। এমনকি কোন পুরুষ যদি তার স্ত্রীর পরামর্শ শোনে তবে তা নিয়ে অন্য পুরুষরা হাসি-ঠাট্টা করে; কিন্তু আমাদের পরিবারকে অন্যরা পছন্দ করে। বলে ভারী মিষ্টি পরিবার।
আমার আম্মু মানুষ হিসাবে অত্যন্ত ধর্মভীরু। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন; কিন্তু মসজিদে যেতে পারেন না। মসজিদে যাওয়ার অধিকার শুধু পুরুষদের। আম্মু নাচ পছন্দ করেন না। তবে সাজতে ভালোবাসেন, ভালোবাসেন নকশা করা পোশাক-আশাক, সোনার হার, সোনার চুড়ি—এসব পরতে। তবে আমার মনে হয়, আমি আব্বুকে বেশি ভালোবাসি এবং সাজগোজ করতে পছন্দ করি না বলে আম্মুর মনে হয়তো খানিকটা দুঃখ আছে। শপিংয়ে যেতে আমার খুব বিরক্তি লাগে। নাচ ভালো লাগে। স্কুলের বান্ধবীদের সঙ্গে দরজা বন্ধ করে খুব নাচা-নাচি করি আমরা।
