যক্ষ্মা থেকে রক্ষা করে ওরা

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:৪৪
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ভাটপাড়া ইউনিয়নে বাস করেন নেহারা বেগম। স্বামী তার আবু তাহের। অনেকদিন পেটে ব্যথায় কষ্ট পেয়ে পরে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যান। এক্সট্রা পালমোনারী টেস্ট-এর মাধ্যমে জানতে পারেন তার যক্ষ্মা হয়েছে। স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে তাকে একদিনের ওষুধ খাইয়ে তিনদিনের ওষুধ দিয়ে দেয়। এই তিনদিনের মধ্যে নেহারা সেবিকা আপা রওশন আরাকে খুঁজে পান। তখন থেকে এই সেবিকা আপাই তার ভরসা। প্রতিদিন ফজরের নামাজ পড়ে তিনি সেবিকা আপার বড়ি ওষুধ খেয়ে আসেন। তিনি জানেন একনাগাড়ে ৬ মাস ওষুধ খেলে তিনি ভালো হয়ে যাবেন। এমন অনেকে তিনি দেখেছেন তাছাড়া স্বাস্থ্যকর্মী আপাও তাকে বলেছেন। এমন করেই সেবিকা, স্বাস্থ্যকর্মী আপা, ল্যাব আপা এবং প্রোগ্রাম অর্গানাইজার তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে সারিয়ে তুলছেন অসংখ্য যক্ষ্মা রোগীকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নিয়ন্ত্রণে ২০টি ইউনিয়নে এমন অসংখ্য নারী দাঁড়িয়েছেন যক্ষ্মা রোগীদের পাশে। তাদের সেবায় ‘রক্ষা নাই’ খ্যাত এই রোগ আজ সাধারণ একটি রোগে পরিণত হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার ব্র্যাক ও সরকারের ডটস কার্যক্রমের ব্যবস্থাপক মোঃ সাখাওয়াত হোসেন জানান, ৪জন নারী ফিল্ড অর্গানাইজারের, ১২ জন স্বাস্থ্যকর্মী। এই স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রত্যেকেই ১০ জন সেবিকা আপার কাজ রক্ষণাবেক্ষণ করেন। শুধু তাই নয় এই উপজেলায় ল্যাবপিও অর্থাত্ ল্যাব ফিল্ড অর্গানাইজারও নারী। যারা কফ পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ সনাক্তকরণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বলেন, এই সকল নারীরা তাদের আন্তরিকতা দিয়ে রোগীদের পরম আত্মীয়ে পরিণত হয়। তাদের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুহীলেপুর, উত্তর নাটাই, দক্ষিণ নাটাই, রামবাছিল ভাটপাড়াসহ ২০টি ইউনিয়নের ৭৬২ জন টিবি রোগী ডটস-এর আওতায় চিকিত্সাধীন আছে। তাদের মধ্যে ৪৯৭ জন পুরুষ ও ২৬৫ জন নারী। ৯ হাজার থেকে লেভেল অনুযায়ী ১৫ হাজার টাকা পারিশ্রমিকে তারা ডটস-এ কাজ করছেন। তারা দেশ থেকে যক্ষ্মা দূরীকরণের ব্রত নিয়েছেন। এই উপজেলার রোগীর অবস্থা সম্পর্কে উপজেলা স্বাস্থ্যকর্মী জানান- ২৯৩ জনের কফে যক্ষ্মা সনাক্ত হয়েছে। ২৮১ জন লেজেটিভ রোগী (যাদের কফে যক্ষ্মা) এক্সট্রা পালমোনারী ১০৮ জন, অন্যান্য ৫৭ পুনরায় আক্রান্ত রিল্যাপস ১৮ জন এবং ডিফল্ট ৫ জন রোগী। এই সকল নারীরা মানুষের উপকার করার পাশাপাশি নিজেদের আয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। তাদের আয় পরিবারকে সমৃদ্ধ করছে। সদর উপজেলা ফিল্ড অর্গানাইজার ফেরদৌসী বেগম বলেন ১৮ বছর যাবত্ তিনি ব্র্যাকে কাজ করছেন। স্নাতক সম্পন্ন করে ব্র্যাকে যোগ দিয়ে তিনি মানুষের সেবা করার পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশুনাসহ পরিবারের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন। ১ ছেলে ২ মেয়ের জননী ফেরদৌসী জানান, তিনি কাজে যোগ দিয়ে অনেক ট্রেনিং নিয়ে নিজেকে দক্ষ করেছেন। আজ তার কাছে যক্ষ্মা একটি কোর্সের নাম মাত্র। একই কথা বলেন, সেবিকা রওশন আরা বেগম। ১২ বছরে তিনি ২০ থেকে ২৫ জন রোগীকে ৬ মাসের ডটস কোর্স সম্পন্ন করে ভালো করেছেন। প্রথমে মানুষ যক্ষ্মাকে অনেক ভয় পেলেও আজ সকলে সহজ রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এতে এই নারীদের বিশেষ অবদান আছে। এই অবদানে তাদের অনুভূতি কি জানতে চাইলে ল্যাব ফিল্ড অর্গানাইজার কৃষ্ণা রানী দাস বলেন, ১৩ বছর আগে আমি সাধারণ একজন স্নাতক ডিগ্রিধারী এই কাজে যোগ দেই। দেশ-বিদেশের নানা প্রশিক্ষণ আর ট্রেনিং-এর মাধ্যমে আজ আমাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। আমরা যখন তিনটি স্যাম্পলে কফ পরীক্ষা করে রোগ সনাক্ত করি, তখন রোগীদের চোখে অন্য রকম একটা নির্ভরতা দেখতে পাই। আমরা যা বলি তা তারা এমন আগ্রহ নিয়ে শোনেন মনে হয় তাদের কাছে আমরা যেন এফসিপিএম করা ডাক্তার।