সহপাঠীর সাথে প্রেম, তারপর?

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:৪৭
অন্তুকে খুঁজতে বারান্দার দিকে গেলাম, বেশ ঠান্ডা পড়ে গেছে এখন আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলসে। বেশিক্ষণ বাইরে থাকলে ওর জ্বর এসে যাবে। এখন মা হিসেবে রোজই ছেলের সাথে লুকোচুরি খেলতে হয়। দেখতে দেখতে বছরগুলো কিভাবে পার হয়ে গেল। আমার আর রাকিবের বিয়ের পাঁচ বছর হতে চলল। আমাদের পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেই। আমরা ছিলাম ক্লাসমেট। বন্ধু হিসেবে নানা ক্রিয়েটিভ কাজকর্মের সাথেও সেসময় যুক্ত হই। আমরা বুয়েটে পড়ার সময় বিভিন্ন প্রদর্শনী, বিজ্ঞান বিষয়ক পত্রিকাও প্রকাশ করেছি। ধীরে ধীরে আমি অনুভব করি যে রাকিব আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। তৃতীয় বর্ষে থাকতে ও প্রথম আমাকে ওর মনের কথা বলে। প্রথমে আমি খুব অবাক হয়ে যাই। কেননা আমি সবসময়ই মনে করেছি যে আমরা খুব ভাল বন্ধু। বুয়েটের পরীক্ষায় ও সবসময় প্রথম হত ক্লাসে, আর আমি দ্বিতীয় বা তৃতীয়। আমাদের দুজনেরই ভবিষ্যতে পিএইচডি এবং এ বিষয়ে রিসার্চ করার স্বপ্ন আছে। এসবই আমাদের বন্ধুত্বকে আরো গাঢ় করেছে। যখন বন্ধু থেকে জীবনসঙ্গীর কথা মনে হল, মনে একটা প্রশ্ন এল। কিন্তু পরে কিসের আকর্ষণে আমি জানি না দুজনই দুজনের আরো কাছাকাছি চলে গেলাম। মনে হল আমরা দুজন দুজনকে সবচেয়ে ভাল করে বুঝি ও একে অপরের উপযুক্ত জীবনসঙ্গী। কিন্তু আমাদের সমাজে একটা প্রচলিত ধারণা যে বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর চেয়ে বয়সে একটু বড় হবে। সেক্ষেত্রে স্ত্রী-স্বামীর মধ্যে সম্পর্কে একধরনের নির্ভরশীলতাও কাজ করে। এর মধ্যে বিয়ের মাধ্যমে নতুন জীবন শুরু করা কি আমাদের পক্ষে সম্ভব? দুজনই আমরা ছাত্র। আমাদের সংসার কিভাবে চলবে। পড়াশোনার খরচও আছে। এসব গুরুগম্ভীর বাস্তববাদী চিন্তা-ভাবনা বাদ দিয়ে শুধু মনের অনুভূতিরই জয় হল। আমার পরিবার থেকে সামান্য বাধা আসলেও পরে তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হই, সেটা আমাদের সৌভাগ্য। আমাদের আমেরিকার দুই কাছাকাছি স্টেটের বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির সুযোগ হয়ে গেল। ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে চলেও গেলাম পড়তে। শেষ পর্যন্ত মাস্টার্স করে আমি রাকিবের বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারলাম পিএইচডির জন্য। পিএইচডি সম্পূর্ণ না করেই আমাদের জীবনে প্রথম সন্তান অন্তু এল। এভাবেই বন্যা তার জীবনসংগ্রামের কথা বর্ণনা করছিলেন। ক্লাসমেট যখন জীবনসঙ্গীতে পরিণত হয় তখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শুধু বন্ধুত্বই কাজ করে, বয়সে বড় ভিত্তিতে শুধু স্বামীর প্রতি নির্ভরশীলতা আর সেখানে থাকে না। দুজন ক্লাসমেটের সম্পর্ক যখন প্রেমে রূপান্তরিত হয় এবং একই সাথে তাদের ক্যারিয়ার গড়ার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে হয়, তখন তাদের প্রেমের সম্পর্কে কখনও কখনও ফাটলও ধরে। যেমনটি শুনছিলাম রুপার (ছদ্মনাম) কাছে। রুপা বলছিল আমি ও রাজু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে একই বর্ষের ছাত্র। দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই আমাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অনার্স, মাস্টার্সের বছরগুলো আমার কাছে ছিল স্বপ্নের মত। গত বছর মাস্টার্স সম্পন্ন হলে বাড়ি থেকে আমার বিয়ের জন্য চাপ বাড়তে থাকে। কিন্তু আমি বা রাজু, কেউই চাকরি করি না যে বিয়ে করব। আমার পরিবার তাই রাজুকে মেনে নিতেও প্রস্তুত নন। তারা আমার জন্য ভাল চাকরিজীবী ছেলে খুঁজছিলেন। এসময় আমার একটি ব্যাংকে প্রবেশনারী অফিসার হিসেবে চাকরি হয়। আর রাজু কন্ট্রাক্ট ভিত্তিতে একটি এনজিওতে কাজ করে। হঠাত্ করেই এসময় রাজুর এক নতুন মনোভাব লক্ষ্য করা শুরু করি। ওর চেয়ে আমার চাকরির অবস্থান বেশি ভাল হওয়াটাকে মানতে পারছিল না। কিভাবে জানি আমাদের মধ্যে দূরত্বের সূচনা হয়। হীনমন্যতা থেকেই ও হয়ত ভাবে যে আমি তাকে আর আগের মত সময় দিচ্ছি না, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছি। আমি ওর জন্য চাকরি ছেড়ে দিতেও প্রস্তুত ছিলাম। এসময় ও আমার সাথে কথা বন্ধ করে দেয়। আমাদের বহুদিনের সম্পর্ক যেন সামান্য এক কারণে শেষের পথে এগিয়ে যায়, এখনও মনে হয় আমাদের বন্ধুত্বের গভীরতার অভাবই কি এর পেছনের কারণ? সহপাঠীদের ক্ষেত্রে অনেকসময় নিজস্ব হীনমন্যতা বা সামাজিক চাপ সম্পর্কের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। তারপরও এক্ষেত্রে পারষ্পরিক বন্ধুত্ব শুধুমাত্র একজনের প্রতি অপরের নির্ভরশীলতাকে দূর করে এবং দুজনের সমপরিমাণ অংশগ্রহণ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সুখী পরিবার গড়ে ওঠে।