লাইলী বেগম ভাগ্য বিড়ম্বিত এক অসহায় নারী। যার জীবন আজ ঘিরে রেখেছে কেবল নেই আর নেই; দেখার আপনজন নেই, খাবারের নিশ্চয়তা নেই, শরীরে হাড় ছাড়া মাংস নেই, মুখে হাসির উপলক্ষ নেই, কাঁদার মতো দুঃখ অবশিষ্ট নেই, অসুখে চিকিত্সা নেই, কথা বলার শক্তি নেই, মরলে কবরে মাটি দেয়ার আপনজন নেই। সব হারানো এই অশীতিপর বৃদ্ধা লাইলী বেগম থাকেন তার এলাকার এক আপার সাথে ১৭ সি, আদাবর, ঢাকা-১২০৭। এই আশ্রিতা আপাও একজন বাক-প্রতিবন্ধী। যার সংসার চলে ছেলে-মেয়ের রোজগারে। টানাটানির সংসারেই লাইলী আশ্রিতা। এই লাইলী ছিল শৈশবে বাবা-মায়ের খুব আদরের সন্তান। গ্রামের বাড়ি বরিশাল জেলার গৌরনদী থানার জয়া গ্রামে। বাবা স্বাধীনতার পূর্বে এক সরকারি অফিসে দারোয়ানের চাকরি করতো। ভাগ্য বিড়ম্বিত এই মহিলা অল্প বয়সে বাবা-মাকে হারায়। কখন পেটের ক্ষুধা নিবারণে বাবা-মায়ের আদরের লাইলীর আশ্রয় মিলে তার বাবার অফিসের এক কর্মকর্তার বাসায় কাজের মেয়ে হিসাবে। এক পর্যায়ে নানা অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে লাইলী বেগম এই বাসা থেকে পালিয়ে এসে অন্য এক বাসায় কাজ নেয়। এই বাসার মালিক একদিন তাকে এক লোকের সাথে বিয়ে দেয়। লাইলীর নিজের সংসার হয়। জন্ম নেয় এক ছেলে এক মেয়ে। তার ছেলেটি হারিয়ে যায়। এর কিছুদিন যেতে না যেতেই তার একমাত্র মেয়েটি হঠাত্ অসুস্থ হয়ে মারা যায়। পরপর দুই সন্তানকে হারিয়ে একেবারে শোকে পাথর হয়ে যায় লাইলী। একদিন তার স্বামীও তাকে ফেলে রেখে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। মানসিকভাবে তখন একেবারে ভেঙ্গে পড়ে সে। স্বামী-সন্তান সব হারিয়ে একদিন সে তার এলাকার পরিচিত এই আপার কাছে এসে আশ্রয় নেয়। স্ট্রোক করে চিরদিনের জন্য অবশ হয়ে যায় তার একটি হাত একটি পা। কষ্টের এখানেই শেষ নয়। একদিন শীতে খর-কুটার আগুন পোহাচ্ছিল সে। হঠাত্ তার শরীরে আগুন ধরে যায়। পুড়ে যায় তার দুই হাত এবং পা। অতিসম্প্রতি ডিএসকে নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সিঁড়ি প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজার টাকা অনুদান দিয়ে নিজ উদ্যোগে দু’টি পুরাতন রিকশা ক্রয় করে দিয়েছে তার আশ্রিতা কর্তৃক পরিচালনার শর্তে। আর রিকশা থেকে যে আয় হবে তা দিয়ে তার সব ব্যয় বহন করা হবে। সমাজের এই সব হারানো মানুষগুলোর জীবদ্দশায় অন্ন, বস্ত্র, চিকিত্সা আর বাসস্থানের নিশ্চয়তা বিধান করা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব তেমনি সচেতন নাগরিক হিসাবে আমরাও এই দায় এড়াতে পারি না।
