পর্যটন সম্ভাবনাময় বিলাইছড়ি

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:৫৭
পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির সৌন্দর্য বরাবরই পর্যটকদের আকর্ষণ করে থাকে। তবে রাঙ্গামাটির কিছু কিছু অঞ্চলের সৌন্দর্য পর্যটকদের বিশেষভাবে কাছে টানে, বার বার সেখানে যেতে অনুপ্রাণিত করে। এমনই একটি এলাকা বিলাইছড়ি। বিলাইছড়ি বাংলাদেশের একমাত্র উপজেলা যার সাথে বার্মা ও ভারতের অভিন্ন সীমান্ত আছে। এর চতুর্দিক ঘিরে রয়েছে সবুজ অরণ্য আচ্ছাদিত উঁচু-নিচু পাহাড়, কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ জলরাশি, হ্রদের গা ঘেঁষে দাঁড়ানো খাড়া পাহাড় থেকে প্রবাহিত ঝর্ণা ও ছড়া। এখানে পাখপাখালি ও ঝর্ণার কলতানে ছন্দমুখরিত প্রকৃতির মনমাতানো স্নিগ্ধরূপ যে কোন সৌন্দর্য পিপাসু মানুষের হূদয়কে আলোড়িত করে তোলে। এই অনিন্দ্য সুন্দর বিলাইছড়িতে পর্যটন শিল্প বিকাশের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এখানকার দর্শনীয় স্পটগুলোতে পর্যটকদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির প্রয়োজন। এই অঞ্চলটিকে রাঙ্গামাটির অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আজো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি। যে কারণে দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক বিলাইছড়ির নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এখানকার সবুজ পাহাড়ের উপর নীল আকাশে সূর্যাস্তের রক্তিম কিরণ এবং গোধূলি লগ্নে রাইংখ্যং হ্রদের স্বচ্ছ জলের উপর তার প্রতিফলনের দৃশ্য সত্যিই দেখার মত। বিলাইছড়িতে রয়েছে চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা, ত্রিপুরা, পাংখোয়া, মোরং, কিয়াং ও বম সম্প্রদায়ের বসবাস। তাদের বিচিত্র জীবন প্রণালী, পাহাড়ি রমণীদের হাতেবোনা আকর্ষণীয় কাপড় ও পাহাড়িদের আবাসস্থল মাচারবাড়ির স্থাপত্য শৈলী দেখে যে কেউ অভিভূত হবেন। ইঞ্জিন চালিত বোটে কাপ্তাই হ্রদ ও রাইংখ্যং নদী হয়ে বিলাইছড়ি যেতে দেখা যাবে প্রকৃতির অপূর্ব রূপ। দুই ধারে সবুজ গাছপালায় ছাওয়া পাহাড়, পাহাড়ি ছড়া দেখতে দেখতে নৌকা ভ্রমণের মজাই আলাদা। পাহাড়ের গায়ে কখনো বা কলাগাছ, কখনো বাঁশ ঝাড়, লেকের ধার ঘেঁষে কাশের ঝোপ। দেখা যাবে হ্রদে চলা নৌকাগুলো কখনো মানুষ পারাপার করছে, কখনো বন থেকে আহরিত কাঠ বা লেক থেকে ধরা মাছ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বোট আমতলি মোড় ঘুরলে দূর থেকে বিলাইছড়ি উপজেলা সদরকে দেখে মনে হবে ছবির মত একটা অপূর্ব শহর। বিলাইছড়ির অন্যতম দর্শনীয় স্থান নকাবা ছড়া ঝর্ণা। বিলাইছড়ি লঞ্চ ঘাট নতুবা নলছড়ি ঘাট থেকে ইঞ্জিন বোটে করে বিলাইছড়ি ডেবার মাথা অথবা বাঙ্গালকাটা নামক স্থানে এসে ওখান থেকে পায়ে হেঁটে নকাবা ছড়া ঝর্ণায় আসতে হয়। বিলাইছড়ি সদরের ধুপ্যাচর ও দীঘলছড়ি এলাকায় আছে দুটি সেতু, যা থেকে দর্শনার্থীরা লেকের স্বচ্ছ জলরাশি ও সবুজ পাহাড়ের দৃশ্যাবলী অবলোকন করে। বিলাইছড়ি সদর থেকে পশ্চিম কোণে গাছকাটাছড়া চাঁদেরী ছড়া ঝর্ণা। ঝর্ণাগুলোতে কয়েকশ ফুট উপর থেকে অবিরাম পানি গড়িয়ে পড়ার দৃশ্য দেখতে দেখতে হূদয়-মন হারিয়ে যায় সেই অপরূপ নৈশর্গিক সৌন্দর্যের মাঝে। পাংখোপাড়া বিলাইছড়ির আরেকটি দর্শনীয় স্থান। বিলাইছড়ি সদর থেকে ইঞ্জিন চালিত বোটে করে পাংখোপাড়ায় যেতে সোয়া এক ঘন্টা লাগে। সেখানে দেখা যাবে আঁকা-বাঁকা নদীপথে মনোমুগ্ধকর সবুজের স্নিগ্ধতা। পাংখোয়া সম্প্রদায়ের আবাসস্থলে যেতে ভাঙ্গতে হবে সুউচ্চ সিঁড়ি। ফারুয়া অঞ্চলে গেলে দেখা যাবে শৈল্পিক স্থাপত্যকীর্তির ন্যায় অপরূপ সব পাহাড়। পাহাড়, নদী, হ্রদ, জঙ্গল, পাহাড়ি ঝর্ণা আর পাহাড়ি সংস্কৃতি মিলে বিলাইছড়ি এমনই এক অপূর্ব সুন্দর স্থান। প্রকৃতির আদিম অকৃত্রিমতায় যে কারো চমত্কার সময় কাটবে বিলাইছড়িতে। তবে পর্যটকদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে হোটেল, মোটেল ও রেস্ট হাউস নির্মাণ এবং নকাবাছড়া ঝর্ণায় যাবার জন্য রাজধনছড়া খালে ব্রীজ ও নকাবাছড়া পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ অত্যাবশ্যক। তাছাড়া গাছকাটাছড়ি এলাকায় চাঁদেরীছড়া ঝর্ণায় যাবার পথে সড়ক নির্মাণ করে গাড়ি চলাচলের উপযোগী করা হলে দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটকের আগমন ঘটবে বিলাইছড়িতে।