জার্সি বদলের সুযোগ পাবেন নেতারা

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৪৮
আগামী জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক নেতাদের জার্সি বদলের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে কোন রাজনৈতিক দলে তিন বছর থাকার বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তারা এ সুযোগ পাচ্ছেন না। আরপিও’র ১২ (ঞ) উপ-ধারা বিলুপ্তির ফলে এখন কোন রাজনৈতিক দলের প্রাথমিক সদস্য পদ গ্রহণ করেই যে কেউ অংশ নিতে পারবেন দশম সংসদ নির্বাচনে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মতামত আমলে নেয়া হয়নি। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ সাদিক ইত্তেফাককে বলেন, কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে আরপিও সংশোধনের যে প্রস্তাব দিয়েছিল তাতে ৩ বছরের সদস্যপদ থাকা সংক্রান্ত ধারাটি বহাল ছিল। এই ধারা বাতিলের যে সুপারিশ করা হয়েছিল তাতে কমিশনের মতামত ছিল না। এদিকে, মানবতা বিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের সংসদ নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। কোন দলের একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করলে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর দল যাকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেবে তিনি ছাড়া অন্যদের মনোনয়নপত্র বাতিল বলে গণ্যর বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে বিদ্রোহী প্রার্থী আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এ সংক্রান্ত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন বিল ২০১৩ সোমবার জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয়। আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন। মন্ত্রী সংসদকে জানান, প্রস্তাবিত বিলটি আইনে পরিণত হলে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। এই বিল পাসের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, আরপিও সংশোধনের মাধ্যমে সরকারের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। তারা একতরফা একটি নির্বাচন চায়। এই একতরফা নির্বাচন এবং দল বদলের অপরাজনীতির ক্ষেত্র তৈরি করতেই এই বিল পাস করা হয়েছে। সংসদ নির্বাচন পরিচালনার জন্য ১৯৭২ সালে প্রণীত হয় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ। বিগত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারিকৃত অধ্যাদেশের মাধ্যমে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের বেশকিছু বিধান সংশোধন করা হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ১২ নভেম্বর এই অধ্যাদেশ সংসদে পাস হয়। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ -এর ২০০৯ সালের সংশোধিত বিধানের ১২ ধারায় প্রার্থীদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বর্ণনা রয়েছে। ওই ধারার (ঞ) উপ-ধারায় উল্লেখ রয়েছে, ‘কোন ব্যক্তি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসাবে ৩ বছর না থাকলে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য হবেন। আইনের এই বিধানটিকে বৈষম্যমূলক মনে করেন সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান এডভোকেট ফজলে রাব্বী এমপি। তিনি বলেন, এই বিধানের ফলে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ও পুরনো রাজনৈতিক দলে কাউকে যোগদানে নিরুত্সাহিত করা হচ্ছে। অন্যদিকে তিন বছর হয়নি এমন নিবন্ধিত দলে যে কেউ যোগ দিয়ে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন। প্রসঙ্গত, আইনের এই ধারার শর্তাংশে বলা আছে, ‘নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কোন রাজনৈতিক দলের প্রথম নিবন্ধিকরণের তারিখ হতে তিন বছর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ঐ দল কর্তৃক মনোনীত প্রার্থীর ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য হবে না।’ অর্থাত্ কোন নতুন রাজনৈতিক দল আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যদি নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হয়, তাহলে ওই দলের ক্ষেত্রে তিন বছরের সদস্য থাকার বাধ্যবাধকতা থাকছে না। এর ফলে ‘কিংস পার্টি’ গঠনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং তার গঠিত নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে ভাঙ্গার এবং ওই দুইটি দলের সংস্কারপন্থীদের দিয়ে আলাদা দল গঠন করার জন্যই সুকৌশলে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে এই বিধান রেখেছিল। তবে আইন বিশেষজ্ঞের মতে, কোন রাজনৈতিক দলে তিন বছর থাকার বাধ্যবাধকতা নতুন-পুরাতন সকল দলের জন্য প্রযোজ্য হওয়া উচিত। তাহলে নির্বাচনকালীন ‘কিংস পার্টি’ গঠনের তত্পরতা বন্ধ হবে। একইসঙ্গে নির্বাচনের সময়ে দলবদলের যে হিড়িক সেটিও থাকবে না। তারা বলেছেন, এই বিধানটি বাতিল হওয়ায় দলের গণতন্ত্র নষ্ট হবে এবং প্রকৃত রাজনৈতিক ব্যক্তিরা বঞ্চিত হবেন। একই সঙ্গে নির্বাচনে কালো টাকার দৌরাত্ম্য এবং মনোনয়ন বাণিজ্য শুরু হবে। এদিকে, ১৩ ধারা সংশোধন করে প্রার্থীর জামানতের টাকা দশ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। এই টাকা নগদ, ব্যাংক ড্রাফট, পে-অর্ডার অথবা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা দিতে হবে। ১৬ ধারা সংশোধন করে বলা হয়েছে, কোনো একটি আসনে একটি দল থেকে একাধিক প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়া হলে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের দিনের মধ্যে দল কর্তৃক লিখিতভাবে একজন প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে প্যানেলের অন্য প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল বলে গণ্য হবে। বিলে প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় ১৫ লাখ টাকার পরিবর্তে ২৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। ৪৪সিসি ধারা সংশোধনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে গিয়ে দলীয় প্রধানের যে ব্যয় হবে, তা নির্বাচনী ব্যয় হিসাবে বিবেচিত হবে না। ৯০/এফ ধারায় বলা হয়েছে, নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের তহবিলে একজন ব্যক্তি অনুদান হিসাবে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা এবং প্রতিষ্ঠান ২৫ লাখ টাকা দিতে পারবে। বিদ্যমান আইনে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ এবং প্রতিষ্ঠান ২৫ লাখ টাকা অনুদান হিসাবে দিতে পারেন। উপেক্ষিত ইসির মতামত ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ড. শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন আরপিও’র অধিকতর সংশোধন সংক্রান্ত কিছু প্রস্তাব আইনমন্ত্রণালয়ে পাঠান। পরবর্তীতে বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পরপরই তাদের মতামতের জন্য ওই প্রস্তাব ফেরত পাঠায় মন্ত্রণালয়। পরবর্তীতে বর্তমান কমিশন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠকের পর আরপিও’র খসড়া চূড়ান্ত করে। গত মে মাসে তা পাঠানো হয় আইন মন্ত্রণালয়ে। ২১ মে আরপিও সংশোধনী প্রস্তাবটির কিছু বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে নির্বাচন কমিশনে ফেরত পাঠানো হয়। ২৫ জুলাই আরপিও-র সংশোধনী প্রস্তাব বর্তমান কমিশনের আমলে দ্বিতীয় দফায় আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। দুই কমিশনের প্রস্তাবেই ১২(ঞ) উপ-ধারাটি বহাল ছিল। এমনকি মন্ত্রণালয় ওই ১২(ঞ)উপ-ধারাটি তুলে দেয়ার জন্য কমিশনের কোন মতামত নেয়নি। উল্লেখ্য, গত রবিবার সংসদে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এডভোকেট মো. ফজলে রাব্বী মিয়া আরপিও বিলের চূড়ান্ত রিপোর্ট উত্থাপন করেন। আর গত বৃহস্পতিবার সংসদীয় কমিটি বৈঠকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বসে বিলের রিপোর্ট চূড়ান্ত করে।