গত বুধবার ছিলো আমাদের প্রিয় কবি শামসুর রাহমানের শুভ জন্মদিন। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের এই দিন তিনি ঢাকা শহরের মাহুতটুলির ৪৬ নম্বর বাড়িতে সকাল ১০টায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মুখলেসুর রহমান চৌধুরী এবং মায়ের নাম আমেনা খাতুন। তার পৈতৃক বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার পাড়াতলী গ্রামে।
শামসুর রাহমান বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। তিনি বড়দের জন্য কবিতা, গল্প, উপন্যাস, অনুবাদ ও আত্মজীবনী লেখার পাশাপাশি ষাটের দশক থেকে ছোটদের জন্য নিয়মিত লিখেছেন। তার খ্যাতি কবি হিসেবে হলেও শিশুতোষ ছড়া-কবিতা রচনায় সমান পারদর্শী ছিলেন। তিনি ছোটদের জন্য স্মৃতিকথা, গল্প ছড়া-কবিতা ও গান লিখেছেন। ছোটদের জন্য রচিত তার ছড়া-কবিতার বইয়ের সংখ্যা তেরোর অধিক। অনেকেই এ খবর রাখেন না। তার রচিত ছড়া-কবিতাগুলো অপূর্ব। শৈশব-কৈশোরের কাহিনী নিয়ে রচিত স্মৃতির শহর বইটি বারবার পড়তে ইচ্ছে করে।
কবি শামসুর রাহমানের শৈশব-কৈশোর কেটেছে পুরনো ঢাকায়। তবে দাদা-নানা ও মা-বাবার সাথে নিজের গ্রামে গেছেন মিয়মিত। একাত্তরের অর্ধেকটা সময় পালিয়ে থেকেছেন পাড়াতলীতে। গ্রামকে তিনি প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। ৭ বছর বয়সে তিনি পোগোজ ইশকুলে ভর্তি হন। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আই.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ওই বছরই ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ৩ বছর পড়াশোনা করেও পরীক্ষা দেননি। পরে পাস কোর্সে বিএ পাস করে একই বিষয়ে এম এ ভর্তি হন এবং প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েও শেষ পর্বের পরীক্ষা দেননি। এভাবেই তার পড়াশোনার সমাপ্তি ঘটে।
কর্মজীবনে ১৯৫৭ সালে প্রথমে তিনি দৈনিক মর্নিং নিউজে সাংবাদিক হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। পরের তিন বছর তিনি বাংলাদেশ বেতারে অনুষ্ঠান প্রযোজক হিসেবে কাজ করেন। এরপর আবার তিনি পূর্বের কমস্থলে ফিরে আসেন। ১৯৬৪ সালে তিনি দৈনিক পাকিস্তান (দৈনিক বাংলা) সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীকালে ১০ বছর তিনি দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি অনেক সম্মাননা, উপাধি, পদক ও পুরস্কার লাভ করেছেন। এগুলো হলো: আদমজী পুরস্কার, বাংলা একাডেমী পুরস্কার, একুশে পদক, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক, মিতসুবিসি পুরস্কার, স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার, আনন্দ পুরস্কার, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি.লিট উপাধি, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি. লিট উপাধি, জীবনানন্দ পুরস্কার ও সার্ক পোয়েট সম্মাননা।
উনিশ বছর বয়সে তিনি লেখালেখি শুরু করেন। তার প্রথম প্রকাশিত কবিতার নাম ‘উনিশশ’ ঊনপঞ্চাশ’। এটি নলিনীকিশোর গুহ সম্পাদিত সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় ছাপা হয়। বড়দের জন্য প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’। ছোটদের জন্য প্রকাশিত প্রথম বইটি ছড়া-কবিতার। এটির নাম ‘এলাটিং-বেলাটিং’। প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে।
ছোটদের জন্য তার শিশুতোষ গ্রন্থগুলো হলো: এলাটিং-বেলাটিং, ধান ভানলে কুড়ো দেবো, গোলাপ ফোটে খুকির হাতে, স্মৃতির শহর, রংধনু সাঁকো, লাল ফুলকির ছড়া, নির্বাচিত ছড়া-কবিতা, নয়নার জন্য, তারার দোলনায় দীপিতা, ছড়া সমগ্র, আমের কুড়ি, ইচ্ছে হলো যাই ছুটে, চাঁদ জেগেছে নদীর বুকে ও সবার চোখে স্বপ্ন।
লেখালেখি সম্পর্কে কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন: যখন খুব ছোট ছিলাম, কারও মুখে ছড়া শুনেছিলাম বলে মনে পড়ে না। এটা কোনো শিশু কিংবা বালকের জন্য সুখকর কথা নয়। অথচ আজকাল কত শিশুকে চমত্কার ছড়া বলতে শুনি। আমার ছেলেবেলায় যারা ছোট ছিল তারা অনেকেই নিশ্চয়ই ছড়া শুনত আর নিজেরা দুলে দুলে আওড়াত। আমার বেলা সেটি ঘটেনি বলে আমার অনেক কষ্ট হয় আজও। তবে আমার নানী দুপুরবেলা আমাকে খাইয়ে-দাইয়ে শীতলপাটিতে শুইয়ে তালপাতার হাতপাখা চালাতে চালাতে তার ছোট নাতিটিকে ঘুম পাড়াতেন। তিনি ঘুমপাড়ানি মাসিপিসিকে না ডেকে ছোট-ছোট গল্প শোনাতেন। সেসব গল্পে রাজপুত্র, রাজকন্যা, পঙ্খিরাজ ঘোড়া, রাক্ষস, খোক্কস আর মস্ত বড় পাষাণপুরীর কথা থাকত। বড় ভালো লাগত সেসব গল্প শুনতে। কখনো কখনো বন্দিনী ঘুমন্ত রাজকন্যার গল্প শুনতে শুনতে নিজেই ঘুমিয়ে পড়তাম। ছড়ার সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক পরে, যখন আমি রীতিমতো বড়সড়। এখানে বলা দরকার, ছেলেবেলায় যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ছোটদের জন্য লেখা ‘হাসিখুসি’ বইটিতে হারাধনের দশটি ছেলের বিষয়ে একটা স্মরণীয় ছড়া পড়েছিলাম। তখন সেই ছড়া পড়ে মন কেমন করছিল ছেলেগুলোর জন্য। বয়স বাড়ার পর অবশ্য বহু ছড়া পড়েছি। এখনো পড়ি। লোকজ ছড়া, রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার রায়, অন্নদাশঙ্কর রায় এবং আরো অনেকের মন কাড়া ছড়া। লোকজ ছড়া ভেঙে নিজের মতো করে পাকিস্তানি আমলের হাল-হকিকত এবং তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বেশকিছু ছড়া লিখেছি। কখনো কখনো সাম্প্রতিক ঘটনাও আমার ছড়ায় ঠাঁই করে নেয়। তবে শুধু বাস্তব আমার ছড়ার বিষয়বস্তু নয়, কল্পনার রাজ্যের কথাও অনেক জায়গা জুড়ে থাকে।
শামসুর রাহমানের কাব্যজগতের যারা একান্ত পাঠক, তারা নিশ্চয়ই বলবেন তার শিশুতোষ রচনা কাব্যের মতোই উজ্জ্বল, কোন কোন ক্ষেত্রে বেশি ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাই তার লেখা সম্পর্কে বলেছেন:
পাঠক পড়ে আনন্দ পাক, তার মনের পাতা জুড়ে লেখকের নাম উজ্জ্বল হয়ে থাক— যারা সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে অবদান রাখতে চান তাদের সবারই এটা কাম্য; কিন্তু রুচিশীল, মনকে ছুঁয়ে যায় এমন মৌলিক সৃষ্টি কঠিন কাজ। শিশু-কিশোর পাঠকদের সংবেদনশীল মনকে স্পর্শ করে যে রচনা তা লেখা আরো দুরূহ। শিশুদের জন্য লিখতে গেলে আগে শিশুদের মনকে জানতে হয়। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ স্বীকার করেছেন, ‘সহজ করে লিখতে আমায় কহ যে, সহজ কথা যায় না লেখা সহজে।’
শিশুমনের উপর ছাপ ফেলতে পারে এমন সহজ মিষ্টি লেখা উপহার দেয়া সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। সব শক্তিশালী শিশু সাহিত্যিক এক্ষেত্রে সফলতা পান না; কিন্তু শামসুর রাহমানের দক্ষতায় সেটা সম্ভব হয়েছে অনায়াস ভঙ্গীতে।
শামসুর রাহমান-এর ছড়া-কবিতা দুইটি শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। সাহিত্যিক ছড়া এবং সমাজ সচেতন ছড়া। তিনি নিজেই বলেছেন, লোকজ ছড়ার শব্দ সুর ব্যবহার করে আধুনিক রীতিতে ছড়া-কবিতা লিখেছেন। আর এসব ছড়া-কবিতায় দেশ, দেশের মাটি, প্রকৃতি, দেশের রাজনৈতিক অবস্থা এবং শিশু-কিশোরদের সোনালী-রূপালী স্বপ্নের কথা বলা হয়েছে। অত্যন্ত সচেতনভাবে তিনি শব্দ প্রয়োগ করেছেন। আর রবীন্দ্রনাথের মতো ছড়ার গাঁথনিতে ছন্দের প্রাণ যে স্বরবৃত্তে, সেই স্বরবৃত্তেই ছড়া-কবিতা লিখেছেন। স্বরবৃত্তর আমেজ সহজে শেষ হয় না। একারণেই স্বরবৃত্তের তাল-লয় দ্রুত এবং সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য। এখানে তার কটি ছড়া-কবিতার সংক্ষিপ্ত নমুনা দিচ্ছি। তিনি এলাচিং-বেলাচিং গ্রন্থে লিখেছেনঃ
জল-টুপটুপ দীঘির পাড়ে ডালিম গাছের ডাল,
ডালিম গাছে জল ঢেলেছে খুকুমনি কাল।
তোতাপাখি লেজ নাচাল, ডালিম গাছে মৌ,
হঠাত্ দেখি ডুব দিয়েছে লাল শালুকের বৌ।
লাল শালুকের বৌ-এর মাথায় মুক্তো জমে ঐ,
মুক্তো নিল হাওয়ার রাজা, আমরা চেয়ে রই।
--------------------------------------
আলুর পাতা আলুথালু বেগুন পাতায় দই,
সাতটা কাকে খেয়ে গেল, খোকন গেল কই?
খোকন গেছে পাঠশালাতে লাল গামছা গায়,
বইগুলো সব রইল পড়ে বুড়ো বটের ছায়,
খোকন গেছে ক্ষীরসাগরে ময়ূরপঙ্খি নায়\
তার ছড়ায় শিরোনাম হয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, লালন সাঁই ও নাতিন নয়না। নয়নার ছড়া শিরোনামের একটি বইও প্রকাশিত হয়েছে কিছুদিন আগে। একটি কথা পরিষ্কারভাবে বলা যায় যে, তিনি ছেলে ভোলানের জন্য নয়, ছেলে-মেয়ে তথা আমাদের সমাজের প্রতিটি মানুষকে সচেতন করার জন্য ছড়া-কবিতা লিখেছেন। তিনি কোন বিষয়কেই জটিলভাবে উপস্থাপন করেননি। সমাজের অনিয়ম, দুর্নীতি, মানুষকে উত্পীড়ন এবং আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মহান স্বাধীনতা, পঁচাত্তরের নির্মম হত্যাকাণ্ড ও শোষণ-বঞ্চনার প্রকৃত চিত্র তার ছড়া-কবিতায় ছন্দিত। তবে একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো তা হলো, তার জাদুকরী কলমে বারবার স্বাধীনতার কথা ফুটে উঠেছে। স্বাধীনতা বিরোধীদের কথাও তিনি কম লেখেননি বলা যায়- যেন তাড়িত হয়েই লিখেছেন।
শামসুর রাহমান-এর ছড়া-কবিতায় ফুল, পাখি, নদী, মুক্ত আকাশ, বৃষ্টির টপটপানি, চাঁদমামা এবং বন্যার করুণ ছবি আমরা দেখতে পাই। তার প্রত্যেকটি ছড়ায় রয়েছে এক একটি নিটোল চিত্র এবং তা শুধু শব্দ ও মিলের অর্থহীন প্রয়োজনে নয়। একারণেই তার শিশুতোষ রচনার পাঠক সর্বশ্রেণির। তিনি প্রচণ্ডভাবে বাস্তববাদী। সমাজের অনিয়মগুলো তার দৃষ্টি এড়ায় না। সমাজ বাস্তবতার আলোকেই তিনি সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো সহজ-সরল ভাষায় নিপুণভাবে আটকে রাখেন ছন্দে ও মিলে। আমাদের এখানে অনেকই এ ধরনের বিষয় নিয়ে লিখেছেন; কিন্তু তা হয়েছে শ্লোগান ধর্মী এবং তার আবেদন ফুরিয়ে গেছে সাথে সাথে। শামসুর রাহমান একটি ছড়া ও কবিতা লেখেননি, যা সাহিত্যগুণ বিবর্জিত। এক্ষেত্রে তিনি কখনো রূপকের আশ্রয় নেননি। সহজ-সরল বর্ণনাতেই তিনি লেখাটি নির্মাণ করেছেন এবং তার অনুভবের কথা পাঠকদের পাইয়ে দিয়েছেন। এভাবেই তিনি চল্লিশ বছর ধরে ছড়া-কবিতা লিখেছেন এবং তা প্রয়োজনেই।
কবি শামসুর রাহমান ২০০৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার সন্ধ্যে ৬টা ৩১ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। বাঙালির সৃজন মনীষায় তার অবদান অপরিসীম। আমাদের সৌভাগ্য- আমরা তাকে প্রত্যক্ষ করেছি। আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সংগ্রাম ও বিজয়ের সকল সরণিতে তিনি সব সময় যুক্ত ছিলেন। আমাদের সত্তায় তার আসনখানি চির অমলিন।
