আমার কথা

ঝর্ণাদাশ পুরকায়স্থ

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০১৩, ১৮:৩৪
লেখালেখি কিভাবে শুরু করেছি—ঠিকঠাক মনে নেই, তবে ব্যাপারটি ঘটেছে ছোটবেলাতেই। প্রথিতযশা সাহিত্যিকদের মনোমুগ্ধকর গল্প-কবিতা-ছড়া পড়তে পড়তে মনে হতো—এমনটা কি আমিও পারি না? নিজের মনের গোপন কথা, অন্য দশজনের মাঝে ছড়িয়ে দেবার কথা ভাবতে বেশ লাগত। শুরু হলো—কাগজের বুকে কলমের আঁকিবুকি খেলা। এভাবেই অবিরত পড়াশোনা করা ও নিরন্তর লেখার অভ্যেসের মাঝে লেখালেখির শুরু। বহুদিনের পথ চলার পর উপলব্ধি করি— লেখাই আমার দক্ষিণের জানালা। লেখার ব্যাপারে আমার বাবা সুধাংশ শেখর রায় চৌধুরীর নীরব ও গভীর সমর্থন পেয়েছি শুরু থেকেই। কাগজ ও কলমের অভাব হয়নি কোনদিন। তখন তো বলপেনের প্রচলন ছিল না, বাবা সব সময় দৃষ্টিনন্দন কলম দিয়েছেন আমাকে লেখার জন্য। আমার শিক্ষকরা —যাঁরা প্রচুর বোঝেন ও জানেন তাঁরা সব সময়ই আমাকে —‘দারুণ হয়েছে তো, বেশ হয়েছে তোমার লেখা, চমত্কার হয়েছে—’ এসব বলে আমাকে উত্সাহিত করেছেন। প্রচুর পড়াশোনা করলে কিভাবে লেখার মান ভালো হবে তারও পরামর্শ সময়ে-অসময়ে দিয়েছেন। তারিখটা মনে নেই, আমার প্রথম লেখা আলো-বাতাসের মুখ দেখেছে ১৯৫৫ সালে। দৈনিক সংবাদের ‘খেলাঘর’ পাতায় ‘বাদল দিনে’ শিরোনামের গল্পটি প্রকাশিত হয়। সে ঘটনাটি ছিল হূদয় শিহরিত করা। পত্রিকার পাতায় ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখে এতই বিভোর ছিলাম যে নীল আকাশ, সাদা মেঘের গুচ্ছ, আমলকি গাছের ঝিরিঝিরি পাতা— সবাইকে ডেকে মনে মনে বলেছি— তোমরা পড়বে তো আমার গল্প? কেমন হয়েছে বলবে না? কিশোরী বয়সে সে ছিল এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি। ‘শিশু কিশোর গল্পসমগ্র’ ১ম খন্ড বইটি আমার ভীষণ প্রিয়। নিজের লেখা থেকে বাছাই করা বিচিত্র স্বাদের গল্প এক সঙ্গে প্রথিত করা হয়েছে বলে গল্পের এক বর্ণালী আবহ সৃষ্টি হয়েছে বলেই—এ বইয়ের প্রতিটি গল্পই আমার ভালো লাগে। এরপরও কথা থেকে যায়, একজন সাহিত্যিকের কাছে নিজের লেখা প্রতিটি গল্পই তার সন্তানের মতো প্রিয়। আমার মোট ৬৪টি বই রয়েছে। এর মাঝে ১৬টি ছোটগল্প সংকলন, ১২টি উপন্যাস, ৩৫টি শিশু-কিশোরতোষ ও ১টি স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ রয়েছে। সবগুলোই আমার ভালোলাগার বই। সাহিত্য ভূবনে অবদানের জন্য বিভিন্ন সময়ে নানা পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছি। কমর মুশতারী স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯৮), বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ সাহিত্য পদক (১৯৯৬), ‘একুশ ও মুক্তিযুদ্ধের গল্পগুচ্ছ’- বইয়ের জন্য এম, নুরুল কাদের শিশু সাহিত্য পুরস্কার (২০০৬), অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার (১৪১৫বাং) পশ্চিমবঙ্গের বার্ষিক সাহিত্য পত্রিকা ‘ঊর্মির ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সংবর্ধনা লাভ (ডিসেম্বর-২০০০) উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৫ সালের ২৭ জুলাই সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় গ্রামে জন্ম। বাবা সুধাংশু শেখর রায় চৌধুরী, মা-নীলিমা চৌধুরী। সোনার চামক মুখে নিয়ে জন্মেছি বলা যায়। জমিদারী প্রথা তখনও বিলুপ্ত হয়নি। অভাব-অনটনহীন আনন্দমধুর ছিল পারিবারিক আবহ, তাই আমার শৈশব ও কৈশোরের পৃথিবী ছিল স্বপ্নমাধুরীতে ভরা। মা খুব ভালো গান গাইতেন। তার কাছে হারমনিয়াম বাজিয়ে গান শেখার হাতে খড়ি। বাড়িতে বিশাল পারিবারিক লাইব্রেরি ছিল। ছোটবেলা থেকে বুঝে না বুঝে বই পড়ার অভ্যেস গড়ে ওঠার কারণে সাহিত্য জগতে অনুপ্রবেশ বিশেষভাবে সাহায্য করেছে। পরবর্তী জীবনে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা ও বিশ্বের কিছু দেশ ঘুরে আসার সুযোগ পেয়েছি। তাই মানুষের বিচিত্র চিন্তা-চেতনা, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার শরীক হবার কারণে আমার লেখার জগত্ সমৃদ্ধ হয়েছে বলে বিশ্বাস করি। কারণ—মানুষ ও প্রকৃতিই আমার লেখার প্রথম ও প্রধান উপাদান। আমার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। ছোটদের জন্য বেশি লিখেছি। এর মধ্যে তুতু ও টুনটুনির স্বপ্ন, লালুর মুক্তিযুদ্ধ, মেঘ-জোছনায় টুপুর, কাকাতুয়ার মন খারাপ, ইভানের কাজলাদিদি, আকাশপরীর গল্প, মেঘের কাছে ইভুর চিঠি ও গ্রামবাংলার সেরা গল্প বিশেষভাবে উল্লেখ্য।