কয়েক বছর আগে একটি ইংরেজি সিনেমা দেখেছিলাম । সিনেমার নাম ট্রাইএঙ্গেল। গল্পটা এরকম— একটি মেয়ে তার বাড়ি থেকে বের হয়ে, অনেক ঝড়ঝাপটা অতিক্রম করে একটা জাহাজে এসে পৌঁছায়, জাহাজটা চলা শুরু করলে কিছুক্ষণ পর মেয়েটা আবিষ্কার করে ঐ জাহাজে সে ছাড়া দ্বিতীয় কোনো মানুষ নেই। মেয়েটা প্রচণ্ড ভয় পেয়ে জাহাজ থেকে লাফ দেয় এবং অনেক চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে সে তার বাড়িতে ফেরে। এরপর দেখা যায় এই ঘটনাটা মেয়েটার জীবনে বার বার ঘটছে। জাহাজ, বাড়ি—এই গোলকধাঁধায় মেয়েটা বসবাস করতে থাকে। কিছুতেই এই গোলকধাঁধা থেকে মেয়েটা বের হতে পারে না। আমরা এরকম একটা গোলকধাঁধায় পড়েছি। নির্বাচনি প্রক্রিয়া নিয়ে সহিংসতা, রাস্তায় কিছু মানুষের মৃত্যু, ধানের শীষ অথবা নৌকার তিনভাগের দুইভাগ মেজরিটি নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া, ক্ষমতায় যেয়ে নিজেদের মতো করে দেশ পরিচালনা করা, পাঁচ বছর বিরোধীদলের আন্দোলনের নামে সহিংসতা— এভাবেই পাঁচ বছর পার, এরপর আবার নির্বাচন ঘনিয়ে এলে পুরনো গল্পের পুনরাবৃত্তি ।
সমপ্রতি সংবিধানের আলোকে প্রধানমন্ত্রী একটি সর্বদলীয় সরকারের রূপরেখা জাতির সামনে তুলে ধরেছেন। সব দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে নির্বাচনকালীন সময়ের জন্য এক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারব্যবস্থা। প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাব নিয়ে বিরোধী দল দর কষাকষি করতে পারতো । বিরোধী দলের কতজন ঐ সরকারের সদস্য হবেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কে হবেন তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সুযোগ ছিল। কিন্তু বিরোধী দল তা না করে ১০ /১০—নতুন ফর্মুলার উন্মেষ ঘটালো। বিরোধী দলের নেত্রী ৯৬ ও ২০০১-এর মধ্য থেকে ১০ জন উপদেষ্টা এবং সরকার ও বিরোধী দল থেকে পাঁচ পাঁচ করে মোট ১০ জন নিয়ে নির্বাচনকালীন এক সরকারব্যবস্থার কথা বলেছেন; এই সরকারের প্রধান হবেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ একজন ব্যাক্তি। এখন আমরা যদি মাননীয় বিরোধী দলের নেত্রীর এই ১০ /১০ ফর্মুলার ব্যবচ্ছেদ করি তবে কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলানো কঠিন হয়ে যায়। প্রশ্নগুলো এরকম :
১. ৯৬ ও ২০০১-এর যাঁরা উপদেষ্টা ছিলেন, তাঁদের মধ্য থেকে মৃত, শারীরিকভাবে অক্ষম, দায়িত্ব নিতে অপারগ—এই তিন শ্রেণি বাদ দিলে বিরোধী দলের নেত্রী ১০ জন উপদেষ্টা কোথায় পাচ্ছেন?
২. আওয়ামী লীগ ২০০১-এর নির্বাচনে হেরেছিল, হেরে সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ এনেছিল, এখন আওয়ামী লীগ যদি ২০০১-এর যাঁরা উপদেষ্টা ছিলেন তাঁদের প্রতি অনাস্থা জানায় তখন কী হবে?
৩. বিরোধীদলের নেত্রী নির্বাচনকালীন সময়ের সরকারপ্রধান হিসেবে একজন নিরপেক্ষ লোক চেয়েছেন এই মূহূর্তে সারা বাংলাদেশে দুই দলের কাছে গ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ কে ?
৪. মাননীয় বিরোধী দলের নেত্রীর এই ১০ /১০ ফর্মুলা বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কার করতে হবে; ২৫শে অক্টোবরের সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় বিরোধী দলের নেত্রী বলেছেন ২৭শে অক্টোবর থেকে বর্তমান সরকার অবৈধ। তাহলে কীভাবে সংবিধান সংস্কার হবে? আর একটা অবৈধ সরকার কি সংবিধান সংস্কারের এখতিয়ার রাখে?
মাননীয় বিরোধী দলের নেত্রী এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেননি। বিরোধী দলের এই ফর্মুলা নিয়ে প্রিন্টিং ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া বহু আলোচনা করেছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা ফর্মুলাটি সংবিধানসিদ্ধ নয় বলে তাঁদের মত প্রকাশ করেছেন। এই ফর্মুলা বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকেই নিজ উদ্যোগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। এখন দেখার বিষয় হলো, সরকার কি হালের সময় নিজের বলদ মাননীয় বিরোধী দলের নেত্রীকে ধার দেবেন?
এর চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত সর্বদলীয় সরকারের রূপরেখায় দরকষাকষির মাধ্যমে অংশগ্রহণ করে জাতির কাছে নিজেদের পরিচ্ছন্ন রাখা কি অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ হতো না? কারণ বিরোধী দল সবসময়ই ভোটারদের কাছ থেকে সহানুভূতি পেয়ে থাকে। যার প্রমাণ পাঁচ পাঁচটি সিটি কর্রাপোরেশন নির্বাচনে ভোটাররা দিয়েছে। বিরোধী দলের নেত্রী কি এই জনপ্রিয়তা উপেক্ষা করে ১০/১০ ফর্মুলা নিয়েই থাকবেন—সেটাই এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে প্রযুক্তিতে বিপ্লব ঘটেছে, মোবাইল অপারেটরগুলো এখন ত্রিজি প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, জাতিসংঘ ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নসহ সমস্ত বিশ্ব এই নির্বাচনের দিকে চেয়ে আছে। ত্রিশটির বেশি টিভি চ্যানেল, ১০০টিরও বেশি পত্রিকা থাকা সত্ত্বেও যদি বিরোধী দলের নেত্রী কারচুপির জুজুর কারণে নির্বাচন বয়কট করেন তবে কি দল হিসেবে বিএনপিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না? গণতন্ত্র কি তাতে নিরাপদ থাকবে? এক সময়ের প্রবল পরাক্রমশীল দল মুসলীম লীগকেও আমরা হেরে যেতে দেখেছি। এবারের নির্বাচন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য যদি অ্যাসিড টেস্ট হয়ে থাকে, তবে বিএনপির জন্য এটি অস্তিত্ব রক্ষা। বিরোধী দলের নেত্রীকে দ্রুত সিদ্ধান্তে আসতে হবে। কারণ সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। সময় গেলে যে সাধন হয় না তা অনেক আগেই লালন সাঁই বলে গেছেন।
ঢাকা
