আমাদের মত উঠতি বয়সের মেয়েদের বেশি সময় কাটে তাদের মায়ের সঙ্গে। আব্বু ব্যস্ত মানুষ। প্রায় সারাক্ষণ বাইরে বাইরে কাটান। শুধু তার স্কুল নিয়ে নয়, তার সাহিত্যিক বন্ধুবান্ধব আছে অনেক। তাদের সঙ্গে আড্ডা আছে, জিরগা আছে, পরিবেশ রক্ষার ব্যাপার আছে, আমাদের উপত্যকা সুন্দর রাখার বিষয় আছে- এসব নিয়েই সময় কাটে তার। আমার আব্বু অজপাড়াগাঁ থেকে উঠে আসা একজন মানুষ। নিজের চেষ্টাতেই শহরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, সুনাম অর্জন করেছেন।
লোকে তাকে পছন্দ করত। তার কথা শুনতে তারা ভালোবাসত। বাড়িতে অতিথি এলে আমার খুব ভালো লাগত। সন্ধ্যাবেলা মেঝেতে প্লাস্টিকের লম্বা সিট বিছিয়ে আম্মু খাবার দিতেন। থালায় করে দেয়া হত মাংস, ভাত। ডান হাত দিয়ে তা মেখে মেখে খেতাম। এভাবে খাবার খাওয়াই আমাদের এলাকার রীতি। অন্ধকার ঘনিয়ে আসত, আমরা হ্যারিকেন অথবা কুপি বাতির চারদিকে বসতাম। আমাদের বড় বড় ছায়া ঘরের দেয়ালে নড়াচড়া করত। গ্রীস্মে প্রায়ই ঝড়-বৃষ্টি হত। তার সঙ্গে বিজলি চমকাত, দেয়া ডাকত গুরু গুরু। আমি গিয়ে আব্বুর হাঁটুর কাছে ভয়ে জড়সড় হয়ে থাকতাম।
আব্বু উপজাতি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে লড়াইয়ের গল্প, পশতুন বীর এবং দরবেশদের গল্প বলতেন, আমি মোহিত হয়ে শুনতাম। কখনো কখনো তিনি সুরেলা কণ্ঠে কবিতা আবৃত্তি করতেন, কবিতা আবৃত্তি করতে করতে কখনো তার দুইচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরত। সোয়াতের বাসিন্দাদের অধিকাংশই ইউসাফজাই গোত্রের (অনেকে একে ইউসুফজাই বা ইয়োসুফজাই বলে)। এই গোত্রের লোকদের আদি নিবাস আফগানিস্তানের কান্দাহার এবং পশতুনদের মধ্যে এরাই সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বিশাল এলাকাজুড়ে এদের বসবাস।
আমাদের পূর্বপুরুষরা সোয়াতে আসেন ষোড়ষ শতাব্দীতে কাবুল থেকে। কাবুলে তারা এক সময় ক্ষমতাচ্যুত এক তিমুরিদ সম্রাটকে পুনরায় সিংহাসনে বসতে সাহায্য করেছিলেন। সেই সম্রাট পরে তার দরবারে ও সেনাবাহিনীতে ইউসুফজাইদের বড় বড় পদ দিয়েছিলেন। তবে সম্রাটের ঘনিষ্ঠজনেরা তাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, ইউসুফজাইদের এত বাড়তে দিলে একদিন তারাই তাকে তাড়িয়ে ক্ষমতা দখল করবে। এরপর সম্রাট একদিন ইউসুফজাই গোত্রের সমস্ত সরদারকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ করেন। আমন্ত্রিত সরদারগণ যখন নিশ্চিন্ত মনে আহার করছিলেন, তখন সম্রাটের পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী এক সঙ্গে ৬শ সরদারকে হত্যা করা হয়। মাত্র দুইজন বেঁচে ছিলেন। তারা সেখান থেকে পালিয়ে এসে তাদের গোত্রের সমস্ত লোক নিয়ে পেশোয়ার চলে যান। এর কিছুকাল পর তারা সোয়াতে আসেন অন্যান্য গোত্রের সহায়তা নিয়ে তারা আবার যাতে আফগানিস্তানে ফিরতে পারেন- সেই চেষ্টা করতে। কিন্তু সোয়াতের সৌন্দর্যে তারা এমনই মুগ্ধ হন যে, আফগানিস্তানে ফেরার মত পাল্টে তারা সেখানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ইউসুফজাইরা এখানে এসে জনবিহীন এলাকার জায়গা-জমি নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নেন। সেই বাটোয়ারা পদ্ধতি ছিল অদভুত ধরনের। একে বলা হত ‘ওয়েশ’। এই পদ্ধতি অনুযায়ী প্রতি পাঁচ থেকে দশ বছর অন্তর পরিবারগুলো গ্রাম রদবদল করত এবং জমাজমি তাদের ভেতর পুনঃবণ্টন করা হত। প্রতি পরিবারই যাতে খারাপ জমি পাল্টে নিয়ে ভালো জমি চাষবাসের সুযোগ পায়, সে কারণেই এই ব্যবস্থা। এর ফলে নিজেদের মধ্যে কোন্দলও কম হবে বলে মনে করা হত। সে আমলে সোয়াতের প্রতিগ্রামে একজন সরদার থাকতেন। তাকে বলা হত খান। গ্রামে যত সাধারণ মানুষ, কারিগর, শ্রমিক—এরা ছিলেন তার প্রজা। প্রজারা গ্রামের সর্দার বা খানকে খাজনা দিতেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা উত্পাদিত ফসলের একটা ভাগ দিতেন তাকে। শুধু তাই নয়, খানদের প্রত্যেকেরই থাকত নিজস্ব বাহিনী এবং গ্রামের বাসিন্দারা তাদের জমির পরিমাণ অনুযায়ী তাতে লোক জোগান দিতেন। প্রতি খানই শত শত সশস্ত্র লোক রাখতেন হামলা ঠেকাতে এবং একই সঙ্গে অন্যান্য গ্রামে হামলা চালিয়ে লুটপাট করতে।
