রুবেলের হ্যাটট্রিকে রাজকীয় জয়

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৪৮
এই ম্যাচের আগেও তাকে ‘অকার্যকর’ বলে দর্শকের দুয়ো শুনতে হয়েছে। তারপরও ম্যানেজমেন্ট রুবেল হোসেনের ওপর আস্থা রেখেছিলেন। আস্থার প্রতিদান কিভাবে দিতে হয়, তা এর চেয়ে ভালোভাবে দুনিয়ার কেউ বোঝাতে পারতেন বলে মনে হয় না। বৃষ্টি, আইন সবকিছুকে ম্লান করে দিয়ে বাংলাদেশকে ৪৪ রানের অবিস্মরণীয় এক জয় এনে দিলেন হ্যাটট্রিক হিরো রুবেল হোসেন। বাংলাদেশের পক্ষে তৃতীয় হ্যাটট্রিকসহ বাংলাদেশের সেরা বোলিং পারফরম্যান্স করে রুবেল তুলে নিলেন ২৬ রানে ৬ উইকেট। মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে গতকাল রাতের এই জয়ের ফলে তিন ম্যাচ সিরিজের শুরুতেই ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। আরেকটি বাংলাওয়াশের স্বপ্ন এখন দেখা যেতেই পারে। বাংলাদেশের ছুঁড়ে দেয়া ২৬৬ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে ৩ উইকেটে ৮২ রান তুলেছিল নিউজিল্যান্ড। ঠিক সেই অবস্থায় নামল বৃষ্টি; ডার্কওয়ার্থ লুইস মেথড অনুযায়ী তখন বাংলাদেশ জয়ী দল। কারণ, নিউজিল্যান্ডের সে সময় আইনত প্রয়োজন ছিল জয়ের জন্য ২০৮ রান। এরপর বৃষ্টি থামতে নতুন করে লক্ষ্য ঠিক হল- ৩৩ ওভারে ২০৬ রান; মানে বাকি ১৩ ওভারে নিউজিল্যান্ডকে করতে হবে ১২৪ রান। এই দুরূহ লক্ষ্যে খেলতে নেমে অ্যান্ডারসন ও গ্রান্ট এলিয়ট টি-টোয়েন্টিকেও হার মানাতে বসেছিলেন। তাদের তুমুল প্রতিআক্রমণে ম্যাচ নিউজিল্যান্ডের পকেটে যায় যায় অবস্থা। তখনই ভয়ানক এক চেহারায় আসলেন রুবেল হোসেন। নিজের তৃতীয় ও ইনিংসের ২৪তম ওভারে অ্যান্ডারসন, ম্যাককালাম ও নিশামকে আউট করে তুলে নেন নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক। শেষ পর্যন্ত এই হ্যাটট্রিকই খেলার নিয়ামক হয়ে উঠল। আর এই ধাক্কা কাটিয়ে উঠে ১৬২ রানের বেশি যাওয়া হলো না নিউজিল্যান্ডের। কেননা উইলিয়ামসন চোটের কারণে ব্যাট করতে না নামায় ৯ উইকেটে ১৬২ রানে থেমে যায় নিউজিল্যান্ডের ইনিংস। এর আগে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের শুরুটা হয়েছিল যাচ্ছেতাই। টসে হেরে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ২৫ রানের মধ্যেই ফিরে যান প্রথম তিন ব্যাটসম্যান। ইনজুরি কাটিয়ে ওয়ানডে দলে ফেরা টিম সাউদি ৫ রান করা তামিম ইকবালকে ফিরিয়ে প্রথম আঘাতটা হানেন। দলীয় চার রান পরেই এক এনামুল হক বিজয়ের হটকারী এক আচরণের শিকার হয়ে ফেরেন মুমিনুল হক। তামিমের বিদায়ে উইকেটে আসা মুমিনুল তখন স্ট্রাইকই পাননি। ম্যাকক্লানাঘানের বল মিডঅফে পুশ করেই সিঙ্গেলের জন্য কল করেন এনামুল; কিন্তু মাঝপথে এসেই সিদ্ধান্ত বদলে তিনি নিজের উইকেটের দিকে দৌড় দেন। ততোক্ষণে মুমিনুলের আর ফেরার উপায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ননস্ট্রাইকিং প্রান্তে উইকেট ভাঙায় ‘ডায়মন্ড ডাক’ পেয়ে ফিরতে হয় দারুণ ফর্মে থাকা মুমিনুলকে। এই কাণ্ডের জবাব হিসেবে এনামুল হয়তো একটা বড় ইনিংস খেলতে পারতেন; কিন্তু ব্যক্তিগত ১৩ রানে সাউদির বলেই ক্যাচ তুলে দিয়ে সে সম্ভাবনাও শেষ করেন ‘বিজয়’। তবে ২৫ রানে ৫ উইকেট পড়ে যাওয়ার পরই আসলে শুরু হয় বাংলাদেশের আসল খেলাটা। অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম এবং দলে ফেরা নাঈম ইসলাম মিলে অসাধারণ এক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। একদিকে মুশফিকের আক্রমণাত্মক ইনিংস, আরেক দিকে নাঈম ইসলামের ধৈর্যশীল ইনিংস মিলিয়ে চালকের আসনে চলে গেল বাংলাদেশ। শেষ পর্যন্ত এই দুই ব্যাটসম্যানই পুড়েছেন সেঞ্চুরি না পাওয়ার হতাশায়। সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ১০ রান দূরে থাকতে মুশফিকের বিদায়ে ভেঙেছে ১৫৪ রানের এই জুটি। ৯৮ বলে ৮টি চার ও ২টি ছক্কায় সাজানো ৯০ রানের ইনিংস খেলেছেন মুশফিক। মুশফিকের বিদায়ের পরপর নাসিরও এসে একটি মাত্র রান করে ফিরে গেলেন। এরপর মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে জুটি করে আরা কিছুটা পথ এগিয়েছিলেন নাঈম; কিন্তু তিনিও ওই সাউদির বলে সেঞ্চুরি থেকে ১৬ রান দূরেই আউট হয়ে যান। ১১৫ বলে ১২টি চারে সাজানো ৮৪ রানের ইনিংস খেলে ফেরেন নাঈম। এটা রুবেলের পাওনা ছিল! একটা দুটো শব্দে সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন, একটু ঘুরানো-প্যাঁচানো প্রশ্ন হলে উত্তর খুঁজে না পেয়ে বিব্রতভাবে হাসছেন; মাঝে মাঝেই সব আনুষ্ঠানিকতা এড়িয়ে মুখে ফুটে উঠছে তার চিরপরিচিত নিষ্কলুষ হাসি। এই রূপ দেখে অনুমান করাই কঠিন, এই লোকটিই একটু আগে মাঠে বাংলাদেশের ইতিহাস সেরা ওয়ানডে বোলিং পারফরম্যান্স করে এসেছেন। বিশ্বাস করা কঠিন যে, এই মানুষটিই তার ভয়ানক আগ্রাসী রূপ দিয়ে একাই শেষ করে দিয়েছেন নিউজিল্যান্ড দলকে। মাঠে যা কীর্তি করেছেন, এই বিনয়ী, সদাহাস্যময় পেস বোলার রুবেলের হোসেনের নিজেরও তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। হ্যাটট্রিকসহ ২৬ রানে ৬ উইকেট নেয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে এসে বললেন, এমন স্বপ্ন সব বোলারের মতো তারও ছিল। তবে কাজটা যে করে ফেলেছেন, সেটা এখনও বিশ্বাস হয়ে উঠছে না, ‘আমি অনেকদিন ধরেই পুরোনো ফর্মে ফেরার জন্য খুব কষ্ট করছি। প্রিমিয়ারে একটা হ্যাটট্রিকও করেছি। আর সবার মতো এই হাজার হাজার মানুষের সামনে হ্যাটট্রিক করার, ম্যাচ জেতানোর স্বপ্ন আমিও দেখতাম। তবে আজই কাজটা এভাবে হয়ে যাবে, তা কল্পনা করিনি।’ রুবেল এটাকে অকল্পনীয়-মিরাকল অনেক কিছুই ভাবতে পারেন। কিন্তু পাশেই বসে থাকা তার অধিনায় মুশফিকুর রহিম পরিষ্কার বলে দিলেন, এমন কিছুই পাওনা হয়েছিল রুবেলের, ‘রুবেল ইনজুরি থেকে ফেরার পর থেকে প্রচণ্ড পরিশ্রম করছি। প্রিমিয়ারে তো বটেই, টেস্টেও সে অসাধারণ বল করেছে। কিন্তু ওর দুর্ভাগ্য টেস্টে উইকেট পায়নি। ফলে আমি বলবো, এটা ওর পাওনা হয়েছিল। আশা করবো এই ফর্মটা সে ধরে রাখবে।’