‘আই অ্যাম মালালা’

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৪৬
সে আমলে সোয়াতে কোন একক শাসক ছিল না। সে কারণে এই খানদের সঙ্গে ইউসুফজাইদের প্রায়ই ঝগড়া-ফ্যাসাদ লেগে থাকত। নিজ গোত্রের মধ্যেও যে মারামারি হত না—তাও নয়। আমাদের গোত্রের সব পুরুষেরই রাইফেল আছে। যদিও বর্তমানে অন্য কোন পশতুন এলাকায় না গেলে তারা কেউ রাইফেল সঙ্গে নিয়ে ঘোরাফেরা করে না। আমার প্রপিতামহ যখন ছোট ছিলেন তখন প্রায়ই বন্দুক যুদ্ধ হত, সে সব গল্প আমরা তার মুখে শুনেছি। ইংরেজ উপনিবেশ নিয়ে গত শতাব্দীর শেষ দিকে শংকা দেখা দেয় পশতুনদের মধ্যে। ব্রিটিশরা তখন আশপাশ এলাকার প্রায় সবই দখল করে নিয়েছে। তারা ব্যাপক রক্তপাত ঘটানোরও চেষ্টা চালাচ্ছিল। তাই এই বিরোধ অবসানে গোটা এলাকা শাসনের জন্য একজন নিরপেক্ষ লোকের সন্ধান করেন তারা। পর পর দুইজনকে শাসক করা হল কিন্তু তাতে কাজ হল না। শেষে ১৯১৭ সালে সরদারগণ মিলে মিয়াঁগুল আবদুল ওয়াদুদ নামে এক ব্যক্তিকে সুলতান করার সিদ্ধান্ত নেন। আমরা তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ‘বাদশাহ সাহেব’ নামে উল্লেখ করি। তিনি পুরোপুরি নিরক্ষর ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও আপন প্রজ্ঞা দিয়ে সব সমস্যা সমাধান করে উপত্যকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। পশতুনদের হাত থেকে রাইফেল কেড়ে নেয়া আর তাদের দেহ থেকে প্রাণ বের করে নেয়া প্রায় একই কথা। সুতরাং তিনি পশতুনদের কাছ থেকে রাইফেল কেড়ে নেননি। তার বদলে তিনি সারা সোয়াতে বিভিন্ন পাহাড়ের ওপর দুর্গ নির্মাণ করেন এবং একটি সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। ব্রিটিশরা ১৯২৬ সালে তাকে সোয়াতের প্রধান হিসাবে স্বীকৃতি দেয় এবং তাকে ওয়ালি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে। পশতুন ভাষায় ওয়ালি কথার মানে হল শাসক। তিনিই সোয়াতে টেলিফোন ব্যবস্থা চালু করেন, প্রথম প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিতর্কিত ‘ওয়েশ’ প্রথা বাতিল করেন। কারণ লোকজনকে ক্রমাগত গ্রাম এবং জমি পাল্টাতে হলে তারা যেমন গাছপালা লাগাতে পারে না তেমনি স্থায়ী বাড়ি-ঘরও তৈরি করতে পারে না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দুই বছর পর, ১৯৪৯ সালে বাদশাহ সাহেব তার জ্যেষ্ঠপুত্র মিয়াঁগুল আবদুল হক জেহানজেবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। আব্বু বলেন, বাদশাহ সাহেব সোয়াতে শান্তি এনে ছিলেন আর তার পুত্র এনেছিলেন সমৃদ্ধি। জেহানজেবের আমলটা আসলে সোয়াতের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ। তিনি পেশোয়ারে এক ব্রিটিশ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শিখেছিলেন। সম্ভবত তার পিতা নিরক্ষর ব্যক্তি ছিলেন বলে তিনি শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। রাস্তা-ঘাট ও হাসপাতাল নির্মাণের পাশাপাশি সোয়াতে বহু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। গ্রামের বাসিন্দারা খানদের যে খাজনা দিত, ১৯৫০-এর দশকে এসে তিনি তা রদ করেন। তবে সে আমলে মানুষের মত প্রকাশের কোন অধিকার ছিল না। কোন ব্যক্তি ওয়ালির সমালোচনা করলে তাকে সোয়াত উপত্যকা থেকে বের করে দেয়া হত। ১৯৬৯ সালে, যে বছর আমার আব্বুর জন্ম হল, সে বছরই ওয়ালি তার ক্ষমতা ত্যাগ করেন এবং আমরা তখন থেকে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের অংশ হয়ে যাই। কয়েক বছর আগে এর নাম পাল্টে খাইবার পাখতুনখোয়া করা হয়েছে।