মুক্তিযোদ্ধাদের বয়সের কোনো সীমা নেই। বয়সের বেড়াজালে মুক্তিযোদ্ধাদের আটকে রাখা যায় না। মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতির ক্ষেত্রে সরকারের জারি করা বয়স সংক্রান্ত দুটি আদেশ (গেজেট) অবৈধ ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে গতকাল রবিবার এ রায় ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। এদিকে গতকালই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার ৮৪ জনের মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিল করে দিয়েছে। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সুপারিশে মন্ত্রণালয় সনদ বাতিল সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করে।
প্রসঙ্গত ২০১৮ সালের ২১ জানুয়ারি সর্বশেষ জারি করা সরকারি এক আদেশে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বর যাদের বয়স সাড়ে ১২ বছর তারা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি (প্রয়োজনীয় প্রমাণ ও দলিলপত্র সাপেক্ষে) পাবেন। এর আগে ২০১৬ সালের ১০ নভেম্বর অপর এক আদেশে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ যাদের বয়স ১৩ বছর ছিল তারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য হবে।
সরকারের এই দুটি আদেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে পৃথক ১৫টি রিট আবেদন দায়ের করা হয়। ওই রিটের রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল মুক্তিযোদ্ধার বয়স নির্ধারণ সংক্রান্ত সরকারের ওই দুটি আদেশ অবৈধ ঘোষণা করে।
হাইকোর্ট বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে ধর্ম-বর্ণ-বয়সের ভেদাভেদ ভুলে সব বয়সের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। সেখানে বয়স দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা বেআইনি ও সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং সংবিধানের পঞ্চম তফসিলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ভাষণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উদাহরণ তুলে ধরে আদালত বলেন, ৭-৮ বছর বয়সীরাও সে সময় যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। বাংলাদেশে রচিত বই ও নির্মিত সিনেমা আছে শিশু ও কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে। তাই বয়সের ফ্রেমে বেঁধে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি দেওয়া যাবে না।
আদালত রায়ে বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দশ বছর বয়সী শহিদুল ইসলাম লালুকে বীর প্রতীক খেতাব দিয়েছেন। কিন্তু বয়সের সীমারেখার কারণে তাকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। লাল মুক্তিবার্তার বাইরেও অনেক সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা আছে। সুতরাং মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞা পরিবর্তনের কোনো আইনগত এখতিয়ার জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলকে দেওয়া হয়নি।
রায়ের পর্যবেক্ষণে সংবিধানের পঞ্চম তফসিলে ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ এবং ষষ্ঠ তফসিলে স্বাধীনতার ঘোষণা তুলে ধরা হয়। এ সময় রায়দানকারী বিচারক বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। আদালত বলেন, জাতির পিতার এই ভাষণ পড়লে যে কেউ আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়বেন। রায়ে রিট আবেদনকারী মুক্তিযোদ্ধাদের বকেয়াসহ বন্ধ থাকা সম্মানী ভাতা পরিশোধ বা চালু করতে বলেছে আদালত। রায়ের অনুলিপি পাওয়ার দুই মাসের মধ্যে তা কার্যকর করতে বলা হয়েছে।
আইনজীবীরা মনে করেন, ঐতিহাসিক দলিল ও নথিপত্রের ভিত্তিতেই মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি দিতে হবে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোখলেসুর রহমান বলেন, এই রায়ের ফলে এখন মুক্তিযোদ্ধাদেরকে নির্ণয়ে বয়সের সীমারেখা থাকল না। তবে মুক্তিযোদ্ধা সনদ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য আইন তো রয়েছেই।
রিটকারী পক্ষের অন্যতম আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর সাদত বলেন, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যারা ভাতা পেয়ে আসছিলেন তাদের অনেকেই কোনো রকম কারণ দর্শানো নোটিস ছাড়াই ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাদেরকে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত যাদের বয়স সাড়ে ১২ বছর হয়নি তারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচিত হবেন না। কিন্তু রায়ে বয়সের ওই সীমারেখাকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। আদালত মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স সংক্রান্ত সকল গেজেট বাতিল করেছে এবং বকেয়াসহ তাদের সমস্ত পাওনা ফেরত দিতে বলেছে।
