১৭ বছর আগের কথা। রাজশাহী মহানগরীর পাঠানপাড়ার আট বছরের শিশু সোনামিয়া ওরফে সনু মিয়া (বর্তমান বয়স ২৫) পদ্মায় গোসল করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও না পেয়ে ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন মা। হারানো সেই সন্তানকে দীর্ঘ ১৭ বছর পর গত বুধবার ফিরে পেয়ে মা নাসিমা খাতুন কাঁদছেন আনন্দের কান্না। রাজশাহীর পাঠানপাড়ার এ ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সনু মিয়াকে একনজর দেখতে শত শত মানুষ তার নানা বাড়িতে ভিড় করছে। নাসিমা খাতুন জানান, ফিরে পাওয়া সনু পাঠানপাড়ার মৃত ইমদাদুল হকের ছেলে। একই পাড়ায় তার (নাসিমা) মায়ের বাড়ি। বর্তমানে তিনি নগরীর সিঅ্যান্ডবি এলাকার একটি চায়ের দোকানে কাজ করেন এবং সেখানেই বসবাস করেন। তিনি আরো জানান, দীর্ঘ ১৭ বছর আগে ৮ বছর বয়সী সনু পদ্মায় গোসল করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়। এরপর দুই মাস ধরে তাকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পাওয়া যায়নি। ছোটবেলায় সনু খুব চঞ্চল ছিল। এ কারণে তিনি রাগ করে তার ডান হাতের কব্জিতে ও ডান গালে জ্বলন্ত নুন্দার (গোবরের জ্বালানি) দিয়ে ছ্যাকা দিয়েছিলেন। ঐ পোড়া চিহ্ন এখনো সনুর শরীরে আছে এবং ঐ দাগ দেখেই তিনি তার হারানো ছেলেকে সনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি ছেলেকে হারানো ও ফিরে পাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আনন্দের কান্না কাঁদছেন।
জানা গেছে, নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে ভারতের নয়াদিল্লীর নিকটবর্তী এক সাঁওতাল পরিবারে বড় হওয়া সোনা মিয়া এখন বাংলায় ভালো করে কথা বলতে পারেন না। সাঁওতালি ভাষায় তিনি জানান, ভারতের জালাল সাপুড়িয়া নামের একব্যক্তি তাকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত থেকে উদ্ধার করেন। এরপর নয়াদিল্লীর ভুবনীপুরা পাহাড়তলী নামক সীমান্ত এলাকায় সাঁওতাল পরিবারটির আশ্রয়েই তার ১৭ বছর কেটে যায়। ওই এলাকায় তিনি বিভিন্ন বাড়িতে বিয়ে ও জন্মদিনের অনুষ্ঠানে সঙ্গীদের নিয়ে নাচ-গান ও সাপের খেলা দেখিয়ে রোজগার করতেন। সেখানে তিনি জুয়েল নামে পরিচিত ছিলেন।
সনু মিয়া জানান, সম্প্রতি পালিত পিতা জালাল সাপুড়িয়া ও মা মুক্তি তাদের একমাত্র মেয়ে মুক্তার সঙ্গে তার বিয়ের জন্য চাপ দেয়। এতে তিনি আপত্তি জানান এবং বলেন, ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ে হয় না। তখন তার পালিত বাবা-মা তাকে উদ্ধার করার সব ঘটনা খুলে বলেন। এরপরও তিনি রাজি না হওয়ায় তারা তাকে মারধর করেন। এক পর্যায়ে তিনি ছোটবেলার স্মৃতি মনে করে বাংলাদেশের রাজশাহীতে ফিরে আসার সংকল্প করেন।
সনু জানান, রাজশাহীর পাঠানপাড়ার নাম ও তার নানা মৃত রাব্বেলের এক চোখ অন্ধ ছিল এ কথাগুলো তার ঠিকই মনে পড়ছিল। এই সূত্রে তিনি রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা হন এবং বাংলাদেশ-ভারতের হিলি সীমান্ত পার হয়ে গত বুধবার সকালে তিনি রাজশাহীর পাঠানপাড়া নদীর ধারে মা নাসিমাকে খুঁজতে শুরু করেন। এরপর তার মাকে দেখে তিনি চিনতে পারেন এবং জড়িয়ে ধরেন। এদিকে এই ঘটনা জানাজানি হলে এলাকায় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। মুহূর্তের মধ্যে এ খবর সনুর আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। উত্সুক লোকজন সনুকে একনজর দেখার জন্য তার নানা বাড়িতে ছুটে আসে।
