নারী তার প্রজ্ঞা ও দক্ষতা দিয়ে এগিয়ে গেলেও তাকে বার বার পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও ধর্মের দোহাই দিয়ে পিছনে ফেলার চেষ্টা চলে। সমাজে এখনও নারীর অধিকার হনন করা হয়। কিন্তু নারীর অধিকার মানবাধিকার। এই অধিকার রক্ষিত না হলে প্রকৃত অর্থে নারীমুক্তি আসবে না। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলন উদ্বোধনকালে বক্তারা এসব কথা বলেন।
‘জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর অবদানের স্বীকৃতি চাই, অধিকার প্রয়োগের নিশ্চয়তা চাই’ শ্লোগান ধারণ করে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে দুইদিন ব্যাপী এই সম্মেলনের উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। তিনি বলেন, ১৯৪৭-৪৮ সালে এ দেশে মেয়েদের চলাফেরা এক রকম বন্ধই ছিল। সেখান থেকে আজকের এই সম্মেলনে নারীর এই বিশাল সমাগম প্রমাণ করে নারীর কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু নারীর অগ্রগতির পাশাপাশি এটাও সত্যি যে, এখনও আমাদের দেশে পারিবারিক সহিংসতা, রাস্তাঘাটে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, শ্রমিক নির্যাতন, এসিড নিক্ষেপসহ নির্যাতনের নানাবিধ ঘটনা ঘটেই চলেছে। তিনি বলেন, নারীকে যদি কেবল ভোগের বস্তু হিসেবেই দেখা হয় তাহলে সমাজে প্রকৃত অর্থে নারীমুক্তি আসবে না। ঘরে-বাইরে সব জায়গায় নারীর সমান কাজ কিন্তু তার কোন মূল্যায়ন হয় না। নারীকেই তার প্রাপ্য অধিকার আদায় করে নিতে হবে।
সংগঠনের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, দেশে আজ যারা দানবের মতো বিকট আওয়াজ করে দেশের গণতন্ত্র ও নারী সমাজকে ধ্বংস করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। বাংলাদেশের নারী সমাজ-যারা বহুমাত্রিক আন্দোলনের অধিকারী, যাদের হূদয়ে রয়েছে আন্দোলনের গতি-তাদের থামিয়ে দেয়া যাবে না কখনই।
‘ইউএন উইমেন’ এর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ মিজ ক্রিস্টিন সুসান হান্টার বলেন, অর্থনীতিতে নারী অবদানের যদি স্বীকৃতি দেয়া না হয় তাহলে নারী তার দ্বিতীয় মাত্রার অবস্থান থেকে বের হয়ে আসতে পারবে না। জাতিসংঘের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে যে অঙ্গীকারগুলোতে বাংলাদেশ সরকার স্বাক্ষর করেছে, সেগুলো রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে।
স্বাগত বক্তব্যে সংগঠনের সহ-সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম গত চার দশকের অধিক সময় ধরে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নারীর অধিকার রক্ষার আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে বলেন, ২০১৩-এর আগস্ট মাস পর্যন্ত আমাদের কাছে ৩১৯৮টি নারী নির্যাতনের অভিযোগ এসেছে। এটাই প্রমাণ করে যে নারী নির্যাতন কমেনি। নারী নির্যাতন বিরোধী আইন আছে কিন্তু তার বাস্তবায়ন নেই।
অনুষ্ঠানে দুইজন নারী কৃষক বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। এরা হলেন মাজেদা বেগম ও খাদিজা বেগম। তারা বলেন, আমরা নারীরা ঘরের কাজের পাশাপাশি কৃষি কাজ করি, তার কোনো মূল্যায়ন হয় না। নারী শ্রমিক কোহিনূর বেগম বলেন, গার্মেন্টসের ভিতর এবং বাইরে আমাদের কোনো নিরাপত্তা নেই। বর্তমানে আমাদের নূন্যতম বেতন হচ্ছে তিন হাজার টাকা; যা একজন মানুষের জীবিকা নির্বাহের জন্য মোটেই পর্যাপ্ত নয়। আমাদের দাবি এই বেতন বৃদ্ধি করে যেন আট হাজার টাকা করা হয়।
মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানুু বলেন, দেশে নারীর জন্য দেয়া বহু প্রতিশ্রুতি উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। নারী উন্নয়ন নীতির যে সকল কর্মসূচি নারীর ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সহায়ক হতো সরকার অতি কৌশলে সেগুলো এড়িয়ে গেছে।
জাতীয় পতাকা এবং সংগঠনের পতাকা উত্তোলন এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের প্রথম দিনের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। সম্মেলনে ৫৭টি জেলা শাখার ১৬০০ কাউন্সিলর, কর্মী, সংগঠকসহ দুই সহস্রাধিক প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
