আদালত অবমাননা

ট্রাইব্যুনালে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জবাব

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০১৩, ২৩:০৪
গত ১৮ সেপ্টেম্বর একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশো’তে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার বিচারকাজ নিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি ট্রাইব্যুনাল অবমাননার রুলের জবাব দিয়েছেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। গত ২৬ সেপ্টেম্বর যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল অবমাননার অভিযোগে কেন ব্যবস্থা নেয়া হবে না ডা. জাফরুল্লাহকে সশরীরে ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে তার জবাব দাখিলের নির্দেশ দিয়েছিলো। গত ১০ অক্টোবর তিনি বিচারপতি এটিএম ফজলে কবিরের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে জবাব দাখিল করেন। তিন হাজার শব্দের লিখিত জবাবের সংক্ষিপ্ত অংশ তুলে ধরা হলো। এতে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্র ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও, ট্রাইব্যুনালের ইংরেজীতে টাইপ করা পত্র পেয়ে আমি মর্মাহত। এতদসত্ত্বেও ট্রাইব্যুনালের সম্মান রক্ষার্থে আমি আদালতে উপস্থিত হয়েছি। ২৯ বত্সর পূর্বে, সামরিক সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের ইংরেজীতে লেখা একটি অভিযোগপত্র আমি নিঃসংকোচে ফেরত পাঠিয়েছিলাম। পরে পত্রটি বাংলা একাডেমীকে দিয়ে অনুবাদ করিয়ে আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন। সেখানে আমি লিখিতভাবে এবং উপস্থিত হয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছিলাম। মুক্তিযোদ্ধারা বিচারকে ভয় করে না, তবে উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়রানিমূলক অভিযোগে ক্ষুব্ধ হয়। তিনি বলেন, চ্যানেলের অনুষ্ঠানের সঞ্চালককে বক্তব্যের জন্য কোনক্রমে দায়ী করা যাবে না। বরং তারা অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য যে তারা বক্তাদের বাক স্বাধীনতায় কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেননি। ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা মানবতা বিরোধী অপরাধ করেছে, এসব ঘাতকদের সহায়তাকারীও অপরাধী। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাকিস্তানী ঘাতকদের সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে বিচারকার্যকেও সর্বাত্মকভাবে সমর্থন করি। উল্লেখ্য যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫ জন পাকিস্তানী ঘাতককে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন এবং হত্যাযজ্ঞের হোতা জুলফিকার আলী ভুট্টোকে জুন ১৯৭৪ সনে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানিয়ে সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। এই সংবর্ধনার প্রতিবাদকারী মুক্তিযোদ্ধারা রক্ষীবাহিনী দ্বারা প্রহূত হয়েছিলেন। আমি সেই প্রতিবাদের সপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলাম। তিনি বলেন, প্রকাশ্যে আদালতের বিষয় নিয়ে পাবলিকের আলোচনা তো স্বাভাবিক কথা। ঠিক যেভাবে দিনের পর দিন শাহবাগ চত্বরে গণজাগরণ মঞ্চে শিক্ষিত নবীনরা চরম শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দাবী করেছে যা সকল সরকারি ও বেসরকারি টেলিভিশনে সারাদিন প্রচারিত হয়েছে। যুদ্ধ অপরাধীদের বিচার নিয়ে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে অনেক মন্ত্রী সংসদ সদস্য বহুবার চরম শাস্তি ফাঁসির পক্ষে বক্তব্য রেখেছেন এবং কতদিনের মধ্যে কবে শাস্তি দেয়া হবে, সে সম্পর্কেও মন্তব্য করেছেন। পাড়ার সাধারণ মানুষের আলোচনা, শাহবাগ চত্বরে নবীনদের সরব শ্লোগান বা মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য বক্তব্যে ট্রাইবুনালের প্রকাশ্য মামলা পরিচালনা কি বিঘ্নিত হয়েছে? সম্প্রতি আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ এক কর্মশালায় বলেছেন, ‘......কোর্টের ইটও নাকি টাকার জন্য হা করে থাকে। আইনমন্ত্রীর সত্য ভাষণের জন্য কি সুপ্রিম কোর্টে তার বিরুদ্ধে ‘আদালত অবমাননা’র মামলা হবে? তিনি বলেন, গণতন্ত্র, বাক-স্বাধীনতা, সকল প্রকার বৈষম্যের অবসান, সমাজতন্ত্রের মাধ্যমে পশ্চাত্পদ ও অর্থনৈতিকভাবে পতিত শ্রেণীর অধিকার, সুযোগ-সুবিধা এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলাম। বৃটেনে কর্মরত এবং উচ্চ শিক্ষা গ্রহণকারী পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি চিকিত্সকদের সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে ১৯৭১ সনের মার্চ মাস থেকে আমি উদ্যোগ নেই এবং এপ্রিলের শুরুতে বৃটেনে বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠিত হয়। বারডেমের বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সাইদূর রহমান উক্ত সংগঠনের সভাপতি এবং আমি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। বিলেতে আমি ভাসকুলার সার্জন হিসেবে উচ্চ বেতনে কর্মরত ছিলাম এবং ফাইনাল এফ আর সি এস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ১৯৭১ এর মে মাসের শুরুতে আমি এবং তত্কালীন পকিস্তানের একমাত্র কার্ডিয়াক সার্জন ডা. এম.এ. মবিন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের জন্য দিল্লী-কলকাতা হয়ে, আগরতলা পৌঁছাই। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের জন্য কুমিল্লা সীমান্তে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে মেলাঘরে ৪৮০ শয্যার বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয় জুন-জুলাই মাসে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” কোন বায়বীয় ব্যাপার নয়। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে তাদের প্রতিটি কার্যক্রমের মধ্যে সজীব রেখেছে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের অংগ প্রতিষ্ঠান গণবিশ্ববিদ্যালয়ে সকল শিক্ষার্থীদের জন্য মুক্তিযুদ্ধের পাঠ বাধ্যতামূলক। একাত্তরের ঘাতক দালালরা কে কোথায়” শীর্ষক পুস্তকের প্রকাশনার জন্য আমরা আর্থিক সহায়তা দেই। তিনি বলেন, আমি বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য বক্তব্য রাখা বাক স্বাধীনতার অংশ। বাক স্বাধীনতা প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার। দেশবাসী মনোযোগ দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্য লক্ষ্য করে এবং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে বক্তব্য রাখে। এটা তাদের অধিকার। আমিও এ সম্পর্কে বক্তব্য রেখেছি। এতে প্রকাশ্য আদালতের বিচারকার্য বিঘ্নিত হয় না। এ জাতীয় প্রকাশ্য আলোচনার উদ্দেশ্য আদালতকে প্রশ্নবিদ্ধ করে জনগণের মনে ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও অনাস্থা সৃষ্টি নয়। কোন ব্যক্তি বা সাধারণ নাগরিকদের বক্তব্যে ভুল থাকলেও আদালতকে সহিষ্ণুতার পরিচয় দিতে হবে এবং নাগরিকদের অধিকারের পক্ষে রায় কাম্য হবে। অনুষ্ঠানে আমি বলেছি যে, দশজন অপরাধী খালাস পেয়ে যাক তবু যেন একজন নিরপরাধ ব্যক্তি ভুলক্রমে শাস্তি না পায়। প্রসঙ্গক্রমে বলা হয়, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী তার জবানবন্দিতে বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় উনি পূর্ব পাকিস্তানে ছিলেন না। কেবল তাই নয় তার পক্ষে চারজন সাফাই সাক্ষীর নামও দিয়েছেন। প্রথম জন, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য সালমান এফ রহমান। দ্বিতীয় জন হচ্ছেন হাইকোর্টের বিচারক বিচারপতি শামীম হাসনাইন। বিচারপতি হাসনাইন সাক্ষী দিতে রাজীও ছিলেন এবং মাননীয় প্রধান বিচারপতির অনুমতিও চেয়েছিলেন। প্রধান বিচারপতির কাছে লেখা চিঠিতে বিচারপতি শামীম হাসনাইন, সালাহউদ্দিন কাদেরের পক্ষে সাফাই সাক্ষী দিতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এটি সম্ভবতঃ একটি নজির বিহীন ঘটনা। এই চিঠিতে লেখা হয়েছে, ‘এটা সত্য যে একাত্তরের মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে আগস্ট পর্যন্ত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছিলেন। এই চিঠিতে বিচারপতি হাসনাইন বলেছেন, ‘একদিকে আমার সরকারি বাধ্যবাধকতা/আচরণ এবং অন্যদিকে আমার বিবেকের তাড়নায় আমি দগ্ধ।’ তৃতীয় সাফাই সাক্ষী কাইয়ুম রেজা চৌধুরী প্রয়াত বিচারপতি মাইনুর রেজা চৌধুরীর ছোট ভাই এবং চতুর্থজন একজন রাষ্ট্রদূত। প্রসিকিউশন ওয়ারেন্ট জারি করে সালমান এফ রহমানকে শপথ পাঠ করিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করালে আমরা জানতে পারতাম সত্যি কি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ১৯৭১ সনের ২৯ শে মার্চ দেশ ছেড়েছিলেন? তখন সালমান রহমান কোথায় ছিলেন? সত্যি যদি সাকা চৌধুরী ২৯ শে মার্চ ১৯৭১ দেশ ছেড়ে থাকেন, মাঝে মাঝে কি করাচি/লাহোর থেকে চট্টগ্রামে আসেননি? নতুনভাবে অত্যাচারে শামিল হননি? বিবাদী সাফাই সাক্ষী আনতে ব্যর্থ হলে, আদালত কি পারত না সংশ্লিষ্ট এই দুই সাফাই সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে? নতুবা সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ জাগতে পারে। প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে আদালত।