গত কয়েকদিনের চিত্র তো পুরোনো নাটকের নতুন মঞ্চায়ন। তখন আওয়ামী লীগ ছিল বিরোধী দলে, আর বিএনপি এখন বিরোধী দলে। ফলাফল শতাধিক হতাহত, গাড়ি ভাংচুর, জ্বালাও-পোড়াও, বোমা বিস্ফোরণ আরো কত কী। ভাবতেই অবাক লাগে, এ কোন পথে হাঁটছি আমরা। দুটি ট্রেনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো। বিআরটিসির দ্বিতল কিছু বাসে আগুন দেওয়া হলো। লাভ কার হলো আর ক্ষতি কার হলো? কার বাসে আগুন দিলাম? বৃহত্ আকারে রাষ্ট্রীয় সম্পদ না বলে ক্ষুদ্র আকারেই বললাম—এ তো নিজের টাকায় কেনা বাসে, ট্রেনে আগুন দিলাম। মানুষ কত বড় বোকা হলে এমন কাজ করে। অনেকের বোঝার স্বার্থে ভেঙেই বলি—সরকার মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার করে দিলেন। আর সেই ফ্লাইওভার তৈরির খরচ আমরা কোনো কোনো সময় দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে পরিশোধ করছি। এ তো আমার নিজের টাকায় করা ফ্লাইওভার। ভেঙে দিলে সরকারের কী আসে যায়? কার স্বার্থে এগুলো করি? হরতাল চলাকালে এক পিকেটারের নিজের প্যান্টের পকেটেই ককটেল বিস্ফোরণ ঘটলো। দলের জন্য শেষ পর্যন্ত নিজেকে বলির পাঁঠা বানালাম। দল আমাকে কী দিলো? কত লাখ টাকা কিংবা কয়টা বাড়ি গাড়ি কিংবা আমার অনুপস্থিতিতে আমার পরিবারকে? এদিক দিয়ে জঙ্গিদের সঙ্গে কিছু মিল পাওয়া যায়। জঙ্গিদের ব্রেইন ওয়াশ করে আত্মাহুতিতে প্রলুব্ধ করা হয়। ঠিক একই রকমভাবে গণতান্ত্রিক দলগুলোর সমর্থকও আত্মাহুতি দিচ্ছে। এ কোন নেশা? এ কোন আদর্শ? আদর্শিক দিক দিয়ে কোনো দলকে আমার ভালো লাগতেই পারে—তাই বলে দল যখন দেশ, জনগণ এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমার বিরুদ্ধে চলে যায় তখন নিশ্চয়ই ঐ কর্মকাণ্ড সমর্থনযোগ্য নয়।
এ তো প্রতিহিংসাপরায়ণতা। হিংসার রাজনীতি। বিরোধী দলের ডাকা হরতালে সংঘটিত বিভিন্ন জায়গায় হত্যা, অগ্নিসংযোগ, বোমা হামলার বিপরীতে কোথাও কোথাও সরকার দলীয় এমপিরা নিজ দলীয় কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে অবস্থান করেছেন। আর ফলাফল কোথাও কোথাও সংঘর্ষের কারণে সরকার দলীয় কর্মীরাও নিহত। গত টার্মে যখন আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে ছিল তখন লগি-বৈঠা দিয়ে একজনকে পিটিয়ে মারা হয়। গেলো হরতালে দেখলাম এক মটরসাইকেল আরোহীকে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো। ভাবা যায় এ কোন যুগে আমরা বসবাস করছি? জীবন্ত মানুষকে আগুন দেওয়া হয়। পরে লোকটি জীবন রক্ষার জন্য মটরসাইকেল থেকে নেমে পড়লে পিকেটাররা খালি মটরসাইকেলটিকে ধ্বংস করে দেয়। এ কেমন সংঘাত? নিজেরা নিজেদের ক্ষতি করছি।
রাজনৈতিক এই সংঘাতের কারণে দেশের সাড়ে তিন কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ক্ষতির সম্মুখীন। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হরতাল ও সাংঘর্ষিক রাজনীতির কারণে এখন বন্ধ। সামনে জেএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। এ কারণে ২০ লাখ পরীক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকরা রয়েছে চরম উত্কণ্ঠার মধ্যে। ভাবতেই অবাক লাগে আমরা অভিভাবকরাই এই দলগুলোর সমর্থক। কিন্তু এত সমস্যার ভেতরে থেকেও এই সংঘাতকেই আমরা নীরবে সমর্থন করছি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরব ভূমিকা রাখছি। আর প্রত্যক্ষভাবে নিজের ক্ষতি নিজেই করছি।
হরতালে চরম ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরাও। হরতালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন এঁরাই। তারপরের ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছি আমরা জনগণ। অর্থনীতি ধ্বংস করে এমন হরতাল! আর ক্ষমতায় গিয়ে অর্থনীতির উন্নয়নের কথা বলা হয়। আমরাও তাদের সঙ্গে সুর মেলাই।
শুধুমাত্র হরতালকে কেন্দ্র করেই এতগুলো কথা বলা নয়। কথা হলো হিংসার রাজনীতি নিয়ে। আমরা তাহলে কোন পথে হাঁটছি। নিজের ক্ষতি করে এ কোন খেলা? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় দলের প্রতিষ্ঠাতারা একটা আদর্শের ওপর, একটা নীতির ওপর দল প্রতিষ্ঠা করেন। অনেক সমর্থনও জুটে যায়। তারপর ধীরে ধীরে সেই আদর্শ ফ্রেমে বাঁধাই করে দেয়ালে টাঙিয়ে রাখা হয়। আস্তে আস্তে তাতে ধুলোর আস্তরণ পড়ে। একসময় তা পুরোই ঢেকে যায়। আজও অনেকের আদর্শ ’চে’ এখন হয়ে গেছে একটা ব্যবসায়িক ব্রান্ড। তারপরও ভালো যে এ ব্রান্ড নিয়ে সংঘাত সৃষ্টি হয়নি।
আমরা কোন পথে হাঁটছি? এত নীতির কথা বলি, এত বুলি আওড়াই, এত কষ্ট করি তারপরেও এই সংঘাতে আমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেই। লাভবান হয় দল। বিনিময়ে হাজারও মায়ের বুক খালি, হাজারও স্ত্রী-সন্তানের আর্তনাদ। ধুঁকে ধুঁকে মরে হাজারও পরিবার।
আদর্শিকভাবে যে কোনো দলকে ভালো লাগতেই পারে। তাই বলে অপরাধ নীরবে মেনে নেওয়া যায় না। অন্তত এ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে। গণসচেতনতা বাড়াতে হবে। বুঝতে হবে আর অন্যকেও বোঝাতে হবে। তবেই না আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের সুন্দর দেশ পাওয়া যাবে।
নারায়ণগঞ্জ
