ইসির সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনায় হাইকোর্ট

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০১৩, ২২:৫৮
জামায়াতে ইসলামীকে সাময়িক নিবন্ধন দেয়া সংক্রান্ত নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছে হাইকোর্ট। হাইকোর্ট বলেছে, অযোগ্য গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে নিবন্ধন দেয়ার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের ছিল না। আইনে সাময়িক নিবন্ধন দেয়ার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু কমিশন এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে এই সুযোগ দিয়েছে। হাইকোর্টের তিন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত বৃহত্তর বেঞ্চের দুই বিচারপতির রায়ে এ অভিমত দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক এম মোয়াজ্জাম হোসেন দুই বিচারকের এই অভিমতের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তিনি তার রায়ে বলেছেন, নিবন্ধন বাতিলের এই আবেদন আইনি নয় বরং আবেগপ্রবণ। জামায়াতের মত যোগ্যতা নিয়ে খেলাফত আন্দোলনও নিবন্ধন লাভ করেছে। কিন্তু আবেদনকারী পুরো বিষয়টি নিয়ে আদালতে আসেননি। তার উদ্দেশ্য সত্ নয়। গত পহেলা আগস্ট রাজনৈতিক দল হিসাবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধনকে অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত বলে ঘোষণা করে হাইকোর্ট। বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেনের সভাপতিত্বে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি কাজী রেজাউল হককে নিয়ে গঠিত হাইকোর্টের এই বৃহত্তর বেঞ্চের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে এ রায় দেয়া হয়। সংক্ষিপ্ত রায় দেওয়ার তিন মাস পর ১৫৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ পেল। জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের পক্ষে মূল রায়টি লেখেন বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক। তার এ রায়ের সঙ্গে একমত পোষণ করে নিজস্ব অভিমত তুলে ধরেছেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম। বিচারপতি রেজাউল হক রায়ে বলেন, জামায়াত এবং নির্বাচন কমিশন যুক্তি দেখিয়েছে, নিবন্ধনটি সাময়িক ছিলো। কিন্তু সাময়িক নিবন্ধন দেয়া যায় বলে আমরা কোন বিধান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে পাইনি। নিবন্ধন সনদেও সাময়িক নিবন্ধন বলে কোনো বিষয় আমরা পাইনি। ‘সংশ্লিষ্ট বিধিতে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে এটা বলেছে, শর্ত পূরণ না করে দেয়া গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে এ ধরনের কোন নিবন্ধন দেয়ার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের নেই। অথবা নির্বাচন কমিশন ওই গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে শর্ত পূরণে জামায়াতকে অনুরোধ করতে পারে না। কারণ ওই নিবন্ধন প্রথম আইনি কর্তৃত্ব বহির্ভূতভাবে করা হয়েছে। রায়ে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বিভিন্ন নজির উপস্থাপন করে রায়ে বলেন, জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম নবম জাতীয় সংসদের প্রথম বৈঠকের বারো মাস অতিক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নির্বাচন কমিশনে বিবেচনাধীন থাকার দাবির আইনগত কোন ভিত্তি নেই। ওই তারিখের পর এ সংক্রান্ত সকল কার্যক্রমই বেআইনি এবং ক্ষমতা বহির্ভূত ও অশুদ্ধ। বরং নির্বাচন কমিশন নবম জাতীয় সংসদের প্রথম বৈঠকের বারো মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের অনুচ্ছেদ ৯০ এইচ (এফ) এর বিধান অনুযায়ী সাময়িক গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে জামায়াতকে প্রদত্ত নিবন্ধনটি বাতিলের কার্যক্রম গ্রহণ না করে সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব পালনে বিরত থেকে প্রতিনিয়তই সংবিধান ও আইন ভঙ্গ করে চলেছে; যা একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাছে কাম্য নয়। এই নিষ্ক্রিয়তার বিষয়টি জ্ঞাত হয়ে সাংবিধানিক আদালত তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে বিরত থাকতে পারে না। বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের অনুচ্ছেদ ৯০ ডি-তে বা ঐ আইনের অন্য কোথাও নির্বাচন কমিশনকে কোন রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র সংশোধন, পরিমার্জন বা সংযোজনের জন্য তাগিদপত্র প্রদানের মাধ্যমে ‘অভিভাবক’ বা ‘পরামর্শ দাতার’ ভূমিকা পালনের কোন ক্ষমতা ও এখতিয়ার প্রদান করা হয়নি। নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম থেকে প্রতীয়মান যে, ঐ প্রতিষ্ঠানটি জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রটি বছরের পর বছর কথিত সংশোধনের সুযোগ প্রদান অব্যাহত রেখে আইন বহির্ভূত কাজ অব্যাহত রেখেছে; যা বেআইনি। এ ধরনের কাজকে আইনের ভাষায় বলা হয়ে থাকে ‘সংবিধি বা আইনের সাথে প্রতারণা’। বিচারপতি এম মোয়াজ্জামের ভিন্নমত: বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন তার রায়ে রিট আবেদনকারীদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জামায়াতের নিবন্ধনের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান আইনী নয়, বরং আবেগপ্রবণ। একইসঙ্গে আবেদনকারীরা তাদের আবেদনে এটা উল্লেখ করেননি যে, আবেদনকারীদের মধ্যে ১, ২ এবং ১৪ নাম্বার একই ধরনের সাংবিধানিক অযোগ্যতা নিয়ে জামায়াতের সঙ্গেই নিবন্ধনকরণ দৌড়ে অংশ নেয় এবং নিবন্ধন লাভ করে। তারা এটাও বলেননি যে, জামায়াতের মতই যোগ্যতা নিয়ে খেলাফত আন্দোলনও নিবন্ধন লাভ করেছে। এতে প্রমাণ হয় আবেদনকারীরা পরিষ্কার হাতে আদালতে আসেননি এবং তার উদ্দেশ্য সত্ নয়। রায়ে বলা হয়েছে, সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে জামায়াতসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দিতে হয়েছে। এটা স্বীকার করতে হবে জামায়াত তখন একটি প্রধান রাজনৈতিক জোটের অংশ ছিল। এরপর সবদলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। এরপর নির্বাচন কমিশন তাদের সিদ্ধান্ত রিভিউ শুরু করে এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের গঠনতন্ত্র সংশোধনে তাগিদ দেয়া শুরু করে। আবেদনকারীদের মামলা জামায়াতের ধর্মীয় চরমপন্থা, জঙ্গিবাদ এবং জিহাদের দিকে ইঙ্গিত করে। নিঃসন্দেহে এসব বাংলাদেশের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। জামায়াতের যেসব রাষ্ট্রবিরোধী তত্পরতার কথাও বলা হয়েছে তার সবই পুরনো এবং কোনটিই নতুন নয়। তিনি রায়ে বলেন, জামায়াতের নিবন্ধন নিয়ে করা রিট গ্রহণযোগ্য নয়। আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, দলটির নিবন্ধনের বিষয় নির্বাচন কমিশনকে নিষ্পত্তি করার নির্দেশনা দিয়ে রুল নিষ্পত্তি করলে ন্যায় বিচার হবে।