‘আই অ্যাম মালালা’

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০১৩, ২৩:০১
সুতরাং পাকিস্তানের এক গর্বিত কন্যা হিসাবেই জন্ম হয় আমার। তবে আমার মনে হয়, আগে আমি সোয়াতের মানুষ তার পর পাকিস্তানের। আমাদের বাড়ির কাছেই একটা পরিবার আছে। আমার বয়সী একটা মেয়েও আছে তাদের। তার নাম সাফিনা। আমার মত তারও দুই ভাই এবং তারাও আমার ভাইদের বয়সী। তাদের একজনের নাম বাবর, অন্যজনের বাসিত। আমরা সবাই মিলে ক্রিকেট খেলি। কখনো রাস্তায়, কখনো ছাদে। কিন্তু আমি জানি, আমাদের মেয়েদের বয়স যতই বাড়বে, ততই আমাদের ঘরের ভেতর থাকতে হবে। আমরা তখন রান্নাবান্না করি। বাবা ও ভাইদের যত্ন-আত্তি করি, সেটাই তখন সবাই আশা করবে আমাদের কাছে। অথচ ছেলেরা ইচ্ছেমত শহরের সবখানে ঘুরে বেড়াতে পারবে কিন্তু আমি বা আমার মা কোন পুরুষ আত্মীয় ছাড়া বাইরে যেতে পারব না। সে পুরুষ যদি পাঁচ বছরের বালকও হয়, তাতেও সমস্যা নেই। এটাই সেখানকার রীতি। আমি খুব ছোট বেলা থেকে সিদ্ধান্ত নেই, আমি আর পাঁচটা মেয়ের মত হব না। আব্বু বরাবর বলেন, ‘আমার মালালা পাখির মত ইচ্ছেমত ঘুরে বেড়াবে।’ আমার ইচ্ছে জাগে, আমিও আলেক্সান্ডারের মত পাহাড়ে চড়ে জুপিটার ছুঁই। এই উপত্যকা পেরিয়ে চলে যাই, বহু দূর বহু-বহু দূর। কিন্তু যখন দেখি আমার ভাইয়েরা ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে ছাদের ওপর ইচ্ছেমত ছোটাছুটি করছে। লাটাই ঘোরাতে ঘোরাতে অন্যের ঘুড়ি কেটে আনছে- তখন ভাবি, মেয়েরা কি এমন মুক্ত হতে পারবে কোন দিন! আমি জানি, আব্বুর কথা বলতে সমস্যা হয়। লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে অনেক সময় তার কথা আটকে যায়। যখন কথা আটকে যায় তখন একই শব্দ বারবার বলতে থাকেন। বিশেষ করে ক, প, ম, উচ্চারণে তার ঝামেলা হয়। আমি কৌতুক করে বলি, ‘ম-উচ্চারণে ঝামেলা হয় বলেই তুমি আমাকে ‘মালালা’ না বলে ‘জানি’ বলে ডাকো?’ যে মানুষটা কথা বলতে ভালোবাসে, কবিতা পড়তে ভালোবাসে তার জন্য তোতলামিটা যে কতখানি কষ্টের- সেটা আমি আব্বুকে দিয়েই বুঝতে পারি। আব্বুর এক চাচারও তোতলামি আছে। তবে আব্বুর তোতলামিটা বেশি। তার কণ্ঠস্বর যেমন জোরালো তেমনি গম্ভীর। আমার দাদার নাম ছিল রুহুল আমিন। তার নামের মানে হল পবিত্র আত্মা। ফেরেশতা জিব্রাইলেরও একই নাম। কথা বলতে বলতে আব্বুর বেধে গেলে আমার দাদা গর্জে উঠে বলতেন, ‘থুথু ফেল বাছা, থুথু ফেল!’ তিনি তার নাম নিয়ে এতই গর্বিত ছিলেন যে, কেউ তার কাছে এলে যে সব ধর্মীয় উপদেশে রুহুল আমিন নামটি আছে, সেটি তাদের শুনিয়ে দিতেন। তার সময়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ লোক ছিলেন। তবে ভয়ানক বদমেজাজি আর ধৈর্যহীন। মুরগিটা হয়ত উল্টোপাল্টা দৌড়াদৌড়ি করল বা একটা চায়ের কাপ ভাংল-তাতেই রাগে তার চোখ মুখ লাল হয়ে যেত এবং হাতের কাছে যা থাকত ছুঁড়ে মারতেন। আমার দাদিকে আমি দেখিনি। তবে আব্বুর মুখে শুনেছি, দাদার এই বদমেজাজ নিয়ে তিনি খুব তামাশা করতেন। বলতেন, ‘আমার সঙ্গে তুমি সারা জীবন রাগারাগি করে গেলে, আমি মরলে আল্লাহ্ যেন তোমাকে এমন একটা বৌ দেন, যে কখনো হাসে না।’