‘খুব বাঁচতে ইচ্ছে করে। আমি মরতে চাই না। এই ছোট্ট ছেলেটাকে রেখে মরতে চাই না। কিন্তু ভুল চিকিত্সায় আমি আজ মৃত্যুর মুখে। আমি আর মনে জোর পাচ্ছি না। একটু লেখ পত্রিকায়, আমার মত যেন আর কোন মা’কে ডাক্তারদের ভুল চিকিত্সায় মৃত্যুর প্রহর গুনতে না হয়’। সালমার চোখের পানি যেন থামে না...।
সালমা বেগমের বাড়ি সিলেট। পেশায় সাংবাদিক। সর্বশেষ কাজ করেছেন, অনলাইন সংবাদ মাধ্যম ‘বার্তা নিউজ-২৪’ এ ২০১২ সালে। হঠাত্ই ঘাড়ে হাড়ের ব্যথা নিয়ে চিকিত্সকের শরণাপন্ন হন। চিকিত্সা হয় ভুল। চিকিত্সক তাকে খাওয়ান হাড়ের যক্ষ্মার ওষুধ। আরো অসুস্থ হয়ে পড়লে, অন্য চিকিত্সক জানান, তার ‘হাড়ের ক্যান্সার’ হয়েছে। বর্তমানে সালমার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ক্যান্সার ছড়িয়ে গেছে।
সালমার ৬ বছরের একমাত্র ছেলে তামিম। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর শান্তিবাগে বোনের বাসায় কথা হয় সালমা বেগমের সঙ্গে। ক্যামো থ্যারাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ঝরে গেছে তার লম্বা চুল। শুকিয়ে শরীর হয়েছে পাটকাঠির মতো। ক্ষুধা নেই, ঘুম নেই, শরীরে কোন জোড় নেই, চোখেও ঠিকমত দেখেন না। কেবল পানি গড়িয়ে পড়ছে তার দু’চোখ বেয়ে। মাথায় ছোট ছোট নতুন চুলে তাকে দেখাচ্ছে স্কুলে পড়ুয়া বালকের মতো। সালমা কান্নাজড়িত ধরা গলায় বলেন, ‘এখন দ্রুত যদি একটা ভিসার ব্যবস্থা করা যেত তাহলে উন্নত চিকিত্সা নিতে দেশের বাইরে যেতে পারতাম। সালমা বলেন, আমার বড় দুই ভাই থাকেন আমেরিকায়। আমি বড় ভাইদের কাছে যেতে পারলে আমার ভালো চিকিত্সা হতো, আমি সেরে উঠতাম। কিন্তু কে করবে আমাকে এই সহযোগিতা!’
‘সালমা সোবহান ফেলোশিপ’-এর মাধ্যমে ঢাকায় সাংবাদিকতায় আসা। তবে তার লেখালেখির হাতে খড়িটা হয়েছিল আরো আগে। সিলেটের স্থানীয় পত্রিকা— সবুজ সিলেট, শ্যামল সিলেট, সিলেটের ডাক, পত্রিকায় নিয়মিত কাজ করছেন বহু বছর। ইলেকট্রনিক মিডিয়া ‘তারা নিউজ’ এর সিলেট প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। এভাবেই ধাপে ধাপে এগিয়ে গেছেন সালমা। তার লেখনি দিয়ে জয় করে নিয়েছেন মানবাধিকার অ্যাওয়ার্ডসহ সাংবাদিকতায় একাধিক সম্মাননার পুরস্কার।
সিলেটে ‘হাড়ের ক্যান্সার’ সনাক্ত হলে সালমা আসেন ঢাকার মিরপুর-১এ ডেল্টা হাসপাতালে। সেখানে একজন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ সালমাকে দেখেন। তিনি সালমাকে দেখে ক্যামো থ্যারাপি ও রেডিও থ্যারাপি নিতে বলেন। একই হাসপাতালের রেডিও থ্যারাপির কনসালটেন্ট ডাক্তার লুত্ফুন নাহার থ্যারাপি দিচ্ছিলেন। ২১ দিন পর পর একটি করে মোট ৬টি ক্যামো ও ৮টি রেডিও থ্যারাপি নেন সালমা বেগম। এরপর সামলা বেগম দেড় মাস ফলোআপে থাকার পর, এক্সরে, ইউরিন টেস্ট, ব্লাড টেস্ট ও আল্ট্রাসনোগ্রাম করে রিপোর্ট নিয়ে আসলে, ডা. লুত্ফুন নাহার বলেন, ‘আবার ক্যামো থ্যারাপি দিতে হবে’। এরপর লুত্ফুন নাহার একটি ক্যামো থ্যারাপি দিয়ে চলে যান হজ্বে। তখন সালমার লিভারের এসজিপিটি ছিল ১০৪। ডাক্তারের রুটিন মাফিক ২১ দিন পর ক্যামো দিতে এলে, ডা. লুত্ফুন নাহারের অবর্তমানে তাকে দেখেন ডা. মির্জা সাখাওয়াত্ হোসেন। তিনি দেখে বলেন, ‘আপনার লিভারের এসজিপিটি ১০০, লিভারের এই অবস্থায় কোনভাবেই ক্যামো দেয়া যাবে না। তখন সালমা ডাক্তারের কাছে জানতে চান, ‘এসজিপিটি-১০০ থাকা অবস্থায় আপনি ক্যামো দিতে চাচ্ছেন না, তাহলে গত মাসে এসজিপিটি-১০৪ থাকা অবস্থায় ডা. লুত্ফুন নাহার আমার শরীরে ক্যামো দিলো কিভাবে? এর উত্তরে ডা. মির্জা সাখাওয়াত্ বলেন, ‘আমি জানি না, উনি এ অবস্থায় কেন ক্যামো দিলেন, তবে আমি দিতে পারবো না।’ এরপর ডা. মির্জা সাখাওয়াত্ হোসেন সালমা বেগমকে পাঠান ল্যাব এইডের লিভার স্পেশালিস্ট মামুন আল মাহতাবের কাছে। তিনি আল্ট্রাসনোগ্রাফি, ব্লাড পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে বলেন. ‘আপনার লিভারে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে, অবস্থা খুব খারাপও বলা যাবে না, ভালোও বলা যাবে না, অর্থাত্ মাঝামাঝি পর্যায়ে আছে।
