‘আই অ্যাম মালালা’

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০১৩, ২২:২৯
আমার দাদি আমার আব্বুুর এই তোতলামি নিয়ে খুব কষ্ট পেতেন। আব্বুু যখন খুব ছোট তখন এই তোতলামি সারাতে তিনি আব্বুুকে এক পীর সাহেবের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। বাসে চড়ে অনেকটা পথ তারপর এক ঘন্টার পথ পায়ে হেঁটে পাহাড় পেরিয়ে তবে সেই পীর সাহেবের ডেরা। দাদির ভাইপো ফজলি হাকিম আব্বুুকে কাঁধে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই পীর সাহেবের নাম ছিল লেওয়ানো পীর। এর মানে—পাগলা পীর। পাগলা পীর কিছুটা আখের গুড় তার নিজের মুখে নিয়ে কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে সেটা আমার দাদির হাতে দিয়ে বললেন, প্রতিদিন যেন সেই গুড় একটু একটু করে আব্বুুর মুখে দেয়া হয়। কিন্তু পাগলা পীরের সে দাওয়াইতে কোন কাজ হয়নি। আমার আব্বুু যে তোতলা, সেই তোতলাই রয়ে গেলেন। বরং কারো কারো মতে এরপর আব্বুুর তোতলামি আরো বেড়ে গেছে। আব্বুুর বয়স যখন তের, তখন আব্বুু আমার দাদিকে এসে বললেন যে, তিনি একটা কথাবলা প্রতিযোগিতায় নাম দেবেন। এটা শুনে তো দাদির আক্কেলগুড়ুম! আমার দাদা রুহুল আমিন হেসে দিয়ে বললেন, ‘পারবে তো বাছা? একটা শব্দ উচ্চারণ করতেই তো তোমার দুই মিনিট লেগে যায় অনেক সময়।’ আব্বুু বললেন, ‘ঠিক পারব, দেখে নিও! তুমি শুধু লিখে দাও, কি বলতে হবে।’ কথা বলিয়ে হিসাবে আমার দাদা বিখ্যাত। শাহপুর গ্রামের সরকারি হাই স্কুলে তিনি একসময় ধর্ম পড়াতেন। স্থানীয় মসজিদেরও তিনি ইমাম। তিনি কথার যাদুতে সবাইকে মুগ্ধ করে রাখতে জানতেন। জুমার নামাজের আগে তিনি খুত্বা পাঠ করতেন তা সম্মোহিত করে রাখত সবাইকে। অনেক দূর দূর এলাকা থেকে গাধায় চড়ে অথবা পায়ে হেঁটে লোকজন পাহাড় পেরিয়ে আসত তার খুত্বা শুনতে। আমার আব্বুু অনেক বড় পরিবারে সন্তান। তার এক বড় ভাই ছিলেন, তার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। শহিদ রমজান তার নাম। আমি তাকে ডাকতাম চাচা খান দাদা বলে। আমার ফুফু ছিলেন পাঁচ জন। আব্বুুর গ্রামের নাম বারকানা। সেটা একেবারেই অজপাড়াগাঁ। ছোট একটা একতলা বাড়িতে গাদাগাদি করে থাকতেন সবাই। মাটির ছাদ। বৃষ্টি বা তুষারপাত হলে ছাদের ফুঁটা দিয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পানি পড়ত। দিনের বেলা মেয়েরা ঘরে থাকত, ছেলেরা যেত স্কুলে। আব্বুুর মুখে শুনেছি, ‘বিয়ের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া মেয়েদের আর কোন কাজ ছিল না।’ মেয়েরা শুধু যে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেত না তা নয়, সকাল বেলা আমার আব্বুু যেখনে দুধ আর দুধের সর খেতেন তখন তার বোনেরা পেতেন শুধু লাল চা। দুধও জুটত না তাতে। বাড়ির মুরগিতে যে ডিম পাড়ত, তা খাওয়ার অধিকার ছিল না মেয়েদের। ডিম শুধু ছেলেদের জন্য। বাড়িতে যেদিন মুরগি রান্না হত, সেদিন মেয়েদের জন্য বরাদ্দ থাকত শুধু ডানা আর গলা। ভালো মাংস খাওয়ার অধিকার ছিল আমার আব্বুুর, তার বড় ভাইয়ের এবং আমার দাদার। আব্বুু বলেন, ‘আমি ছোট বেলা থেকেই জেনে যাই যে, আমার বোনদের চেয়ে আমি আলাদা।’ আব্বুুদের সে গ্রাম এতই সরু ছিল যে, সেখানে খেলাধুলা করার মত কোন মাঠ ছিল না। টেলিভিশন ছিল মাত্র একটি বাড়িতে। শুক্রবার ভাইয়েরা মিলে যেত মসজিদে। সেখানে গিয়ে তারা দেখত, আমার দাদা দাঁড়িয়ে খুত্বা পাঠ করছেন। তার গলার স্বর ঢেউয়ের মত ওঠা নামা করত, সবাই তা শুনত মন্ত্রমুগ্ধের মত। আমার দাদা ভারতে পড়াশোনা করেছেন। সেখানে তিনি মোহম্মদ আলি জিন্না, জওহরলাল নেহরু, মহাত্মা গান্ধী ও খান আব্দুল গাফ্ফার খানের মত বাগ্মী নেতাদের দেখেছেন। আব্দুল গাফ্ফার খান আমাদের মহান পশতুন নেতা। তিনি স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। আমার দাদা ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট মধ্য রাতে যখন ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে দেশ স্বাধীন হয়, তিনি তার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তার একটা পুরানো রেডিও সেট ছিল, যেটা এখনো আছে আমার চাচার কাছে। সেই রেডিওতে তিনি খবর শুনতেন। মসজিদে তিনি যখন খুত্বা পাঠ করতেন তখন তার মধ্যে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা, পবিত্র কোরআন ও হাদিসের উদ্ধৃতি থাকত। তিনি রাজনীতি নিয়েও কথা বলতে পছন্দ করতেন। সোয়াত পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হল ১৯৬৯ সালে। সেই বছরই জন্ম হয় আব্বুুর। সোয়াত পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়াতে সোয়াতের বহু মানুষ অসন্তুষ্ট হয়। পাকিস্তানের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে তাদের অনেক অভিযোগ ছিল। কারণ তাদের মতে সোয়াতের সাবেক উপজাতীয় পদ্ধতির চেয়ে পাকিস্তানের বিচার পদ্ধতি যেমন ঢিলাঢালা তেমনি কম কার্যকর। আমার দাদা খানদের ক্ষমতা অপরিবর্তীত রাখায় অখুশি ছিলেন।