নির্বাচনে সেনা মোতায়েন চায় ইসি

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০১৩, ২২:০৯
সাংবিধানিক এবং ফৌজদারি কার্য-বিধির ক্ষমতাবলে আগামী সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের আবেদন করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বর্তমান ব্যবস্থায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়ায় সেনা মোতায়েন সংক্রান্ত এই আবেদনের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাছাড়া ইতিমধ্যে বেশকয়েকটি জরিপে আগামী নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের পক্ষে অধিকাংশ মতামত এসেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে তফসিল ঘোষণার পর কমিশন নির্বাচনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে অনুরোধ করবে ইসি। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, আরপিও অনুসারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় যেসব বাহিনী থাকবে তাদের নিয়োজিত রাখা হবে। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনী অন্তর্ভুক্ত না থাকায় সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এবার রাষ্ট্রপতির কাছে সেনাবাহিনী মোতায়েনের আবেদন জানাব। পরিস্থিতি বিবেচনায় এ অনুরোধ জানানো হবে উল্লেখ করেন তিনি। পরে নির্বাচন কমিশনার শাহ নেওয়াজ ইত্তেফাককে বলেন, প্রয়োজনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭৩-এর অধ্যায় ৫ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সেনাবাহিনী মোতায়েন করার আবেদন করা হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে তফসিল ঘোষণার পর রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সেনাবাহিনী মোতায়েনের জন্য সহযোগিতা চাওয়া হবে। গত ৯ অক্টোবর জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হবে।’ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী না থাকলেও সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের সুযোগ রয়েছে। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে।’ আবার গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৫ নং অধ্যায়ে (২) বলা আছে, ‘সরকারের সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষ কমিশনকে উহার দায়িত্ব পালনে সহায়তা প্রদান করিবে, এবং এই উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি, কমিশনের সহিত পরামর্শক্রমে, তাহার নিকট উপযুক্ত বিবেচিত যে কোন নির্দেশ জারি করিতে পারিবেন।’ এই ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে সেনাবাহিনী মোতায়েনের জন্য দাবি করবে কমিশন। তবে রাষ্ট্রপতি প্রয়োজন মনে করলে সেনাবাহিনী মোতায়েন করবেন। এর আগে কোন কিছুই নিশ্চিত নয় বলে মনে করছেন কমিশন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা ইত্তেফাককে বলেছেন, কমিশন থেকে সাংবিধানিক ক্ষমতা বলে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের দাবি জানানো হলে সরকার তাতে সাড়া নাও দিতে পারে। সংসদের দুইটি উপ-নির্বাচন (হবিগঞ্জ-১ ও ব্রা??হ্মণবাড়িয়া-২) এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদা সেনা চেয়ে পাননি। নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে কমিশন থেকে দুইটি চিঠি দেয়া হলে সরকারের পক্ষ থেকে সে চিঠির জবাব দেয়া হয়নি। তবে, চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে ভোট নেয়ার পর নৌবাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এর আগে বিএনপি আমলে একটি নির্বাচনে সেনা চেয়ে পেয়েছিল তত্কালীন কমিশন। পরে এ বিষয়ে আদালতে রিটও হয়েছিল। সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) রকিবউদ্দিন আহমেদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী রাখা না রাখা নিয়ে এক লিখিত বক্তব্যে বলেছেন, ‘এ পর্যন্ত সম্পন্ন নির্বাচনগুলোর প্রতিটির তফসিল ঘোষণার সময় কমিশনকে সার্বিকভাবে যে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে তা হলো- সেনা মোতায়েন করা হবে কি না! প্রকৃতপক্ষে সেনা মোতায়েন সংক্রান্ত কোন বিধান আরপিওতে ২০০১ সালের আগে ছিল না। তারপরও ১৯৭৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্রত্যেক সাধারণ নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বেসামরিক শক্তির সহায়তার জন্য প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের জেলা/থানা/উপজেলা পর্যায়ে প্রেরণ করা হয়েছে। একই দিনে সারাদেশে ৩০০ আসনে একসাথে নির্বাচনের জন্য বাস্তবতা বিবেচনায় প্রয়োজনের তাগিদেই এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ২০০১ সালের ১ নম্বর অধ্যাদেশমূলে ল’ এনফোর্সিং এজেন্সির সংজ্ঞায় ডিফেন্স সার্ভিস অন্তর্ভুক্ত করা হয়; কিন্তু ২০০৯ সালের ১৩ নম্বর আইনে তা বাদ দেয়া হয়।’ ইসির সূত্রমতে, সম্প্রতি সংসদে আরপিওর যে সংশোধনী পাস হয়েছে, সেখানেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনীকে রাখা হয়নি। ফলে বর্তমানে নির্বাচনকালীন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায় আছে পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটলিয়ন, র্যাব, আনসার, বিজিবি ও কোস্টগার্ড। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হবে। আবার ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৮, ১২৯ ও ১৩০ ধারা অনুযায়ী সংসদসহ সব ধরনের স্থানীয় নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা সম্ভব। ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৮, ১২৯ ও ১৩০ ধারায় বলা আছে, কোথাও কোনো বে-আইনি সমাবেশ হলে, বা জনশৃঙ্খলা নষ্ট হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট অথবা পুলিশ বাহিনী তা ছত্রভঙ্গ করে দেবে। পুলিশ বাহিনী ব্যর্থ হলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার জন্য সশস্ত্র বাহিনীর পুরুষ কর্মকর্তাদের সহযোগিতা চাইতে পারবেন। তারপরও ছত্রভঙ্গ করা না গেলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অথবা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে তা ছত্রভঙ্গ করতে পারবেন। তাছাড়া আগামী নির্বাচনে ভোটার, ভোট কেন্দ্র ও ভোট কক্ষ বাড়লেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা তেমনটা বাড়েনি। গতকাল নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ সাংবাদিকদের বলেন, আরপিও অনুসারে আইন-শৃঙ্খলায় (পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি) যেসব বাহিনী থাকবে, তাদের নিয়োজিত রাখা হবে; কিন্তু, এসব বাহিনীর সহায়তা নিয়ে নির্বাচন করা কঠিন হয়ে যায়। তাই, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে সেনাবাহিনী মোতায়েনের জন্য আবেদন জানানো হবে। গত নির্বাচনগুলোতে সেনাবাহিনী সহযোগিতা করেছে। তাই এবারও আমরা তাদের সহযোগিতা চাইব। তিনি বলেন, আমরা আশা করি সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতা হবে। সব দল নির্বাচনে অংশ নেবে। নির্বিঘ্নে নির্বাচন করতে পারবো। বিরোধী দল অংশ না নিলে কমিশন নির্বাচন করবে কী না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন করতেই হবে। আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ কমিশনের নেই। আমরা চাইবো সব দল নির্বাচনে আসুক। তফসিল ঘোষণার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রচারের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিয়ে তফসিল ঘোষণা করা হবে। কমিশন বৈঠক শিগগিরই অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকে তফসিল ঘোষণার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। উল্লেখ্য, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী আগামী ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারির মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন।