ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০১৩, ১৯:০৩
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলার নাম পশ্চিম মেদিনীপুর। অখ্যাত এই জেলার আরেক অখ্যাত মহকুমা ঘাতাল। ঘাতাল মহকুমার এক অজপাড়াগাঁ বীরসিংহ। এই গ্রামে বাস করেন এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ। নাম তার ঠাকুর দাস বন্দ্যোপাধ্যায়। স্ত্রী ভগবতী দেবীকে নিয়ে তার কষ্টের সংসার। নুন আনতে পান্তা ফুরানো পরিবারে ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ঘর আলো করে জন্ম নিল এক পুত্রসন্তান। সেদিন প্রকৃতি হয়ত জেনেছিল সে কি পুণ্যাত্মার জন্ম দিল। কিন্তু দরিদ্র পিতা-মাতার পক্ষে এই সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যত্ গড়া বড় দুঃসহ হয়ে পড়ে। তাই বাবা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় স্ত্রী-পুত্র নিয়ে কোলকাতা শহরে চলে আসেন। কোলকাতা তখন ভারতের বৃহত্তম ব্যবসায়ী নগরী। বৃটিশ বেনিয়ারা কোলকাতাকে নতুনরূপে সাজিয়েছে। চারিদিকে নজরকাড়া দালান আর মসৃণ রাস্তা। কোলকাতায় চালু হয়েছে মানুষে টানা রিকশা। মানুষের চলাচলের জন্য রেলপথ বসেছে। দূর-দূরান্ত থেকে সেইসব রেলগাড়িতে চেপে মানুষ ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় চলাচল করে। তখন রেলগাড়ি নিয়ে সব মজার মজার ছড়া চালু হয়েছে। যেমন, রেলগাড়ি ঝমাঝম, পা ফসকে আলুর দম। সেই কোলকাতা শহরে ঠাকুর দাস বন্দ্যোপাধ্যায় সংসার পাতলেন বড় বাজারের ভগবত চরণ হাউজে। যাকে কেন্দ্র করে এই গল্পের পটভূমি। সেই ঈশ্বরচন্দ্রর বয়স তখন মাত্র ৬ বছর। গ্রাম থেকে উঠে আসা এই বালকই পরবর্তীকালে বিদ্যাসাগর নামে সর্বাধিক পরিচিত হয়ে ওঠেন। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে এমন নৈতিক শিক্ষা দিয়েই শিশুকালে পাঠ অভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তার বর্ণপরিচয় এবং দ্বিতীয় ভাগ ও ধারাপাতই ছিল শিশুদের প্রথম পাঠ। তখনকার দিনে স্কুলে বা পণ্ডিতের টোলে এই তিনখানা বই দিয়ে লেখাপড়ার হাতেখড়ি। ঈশ্বরচন্দ্রের আগে কেউই এ বিষয়ে কোন পুস্তিকা লেখেননি। তাই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বর্ণমালার বই লিখে সেই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন। বিদ্যাসাগর নামটা শুনলেই নদী সাগরের কথা মনে পড়ে যায়। বিদ্যার সাগর। সত্যিই তিনি ছিলেন এমনি। ছোটবেলায় তার দুষ্টুমি ছিল পাড়ার সবচেয়ে আলোচিত। তার দুষ্টুমিতে সবসময় শশব্যস্ত থাকতেন পাড়ার মাসীরা। হয়তো কেউ তার দুষ্টুমিতে অতিষ্ঠ হয়ে ঈশ্বরচন্দ্রের বাবাকে বলে দেবার হুমকি দিলেন- আর যায় কোথায়— ঈশ্বরচন্দ্র জানতেন, বাবা জানতে পারলে ভীষণ রাগ করবে। বিদ্যালয় থেকে ফিরে সেই মাসীকে শায়েস্তা করার ফন্দি আঁটলেন। রাজ্যের ধূলো-বালি ছাদে জড়ো করলেন। বিকালবেলা মাসী হয়ত দুটো ভাত চড়াতে কয়লার চুলা জ্বালিয়েছেন, ঠিক তখনই শুরু হয়ে গেল ঈশ্বরের খেলা। বাতাস দিয়ে সেই ধূলিঝড় তৈরি করে রান্না বানচাল করার চক্রান্ত। হঠাত্ ধূলাবালি দেখে মাসীমা উত্স খুঁজতে যেয়ে দেখতে পেলেন তাদের সাধের ঈশ্বর ছাদে বসে এক মনে ধূলি উড়াচ্ছে। শেষে আদর করে তাকে শান্ত করেই মাসীর রান্না। দুষ্টুমিতে যেমন ওস্তাদ ছিলেন তেমনি মেধায় ছিলেন অদ্বিতীয়। জীবনে কোনদিন ক্লাসে পড়া পারেননি এমন ঘটনা ঘটেনি। তার দুষ্টুমির শিক্ষা দিতে শিক্ষকরা লেখাপড়ার অবহেলার প্রমাণ পাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হতেন। কোনভাবেই তাকে পড়াশুনার জন্য শাস্তি দেয়া যেত না। সে সময় অবশ্য অবাধ্য ছেলেদের জন্যে নানারকম শাস্তির বিধান ছিল। যেমন বেত্রাঘাত, নীলডাউন, বাড়াবাড়ি রকমের অপরাধের জন্য ইট হাতে একপায়ে দাঁড়ানো— আবার সহপাঠীকে হাতে কানমলা ইত্যাদি। বিদ্যাসাগরের আমলের শাস্তি এই কিছুদিন আগেও বলবত্ ছিল। তখনকার দিনে অভিভাবকরা কেবল কানা আর খোঁড়া করা বাদে সব ধরনের শাস্তির জন্য অনুমোদন দিয়ে রাখতেন। ঈশ্বরচন্দ্র সারা জীবনই ভালো ছাত্র ছিলেন। তাই তার জন্য বৃত্তি বরাদ্দ ছিল নিয়মিত। কথায় আছে ঈশ্বরচন্দ্র তার বাবার চেয়েও ছাত্রাবস্থাতে ৪ গুণ বেশি টাকা রোজগার করতেন। বাবা ঠাকুর দাস যখন মাসিক বেতন পেতেন পাঁচ সিকে তখন ঈশ্বরচন্দ্রের বৃত্তি ছিল পাঁচ টাকা। তবে বৃত্তি পাবার আগে পড়াশুনা তৈরিতে ঈশ্বরচন্দ্রকে খুবই কষ্ট করতে হয়েছে। বাবা ঠাকুর দাসের উপার্জন ছিল সীমিত। তার পক্ষে নিয়মিত কেরোসিন কেনা সম্ভব ছিল না। তখনকার দিনে বিজলি বাতিও ছিল না। তাই সবাইকে কেরোসিন বাতি জ্বালিয়ে রাতের কাজ করতে হতো। কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্রের জন্য এ ব্যবস্থা না থাকায় তিনি পৌরসভার বাতির নিচে বসে পড়াশুনা করতেন। বিদ্যাসাগরের মাতৃভক্তি ছিল ঐতিহাসিক। মা আসবার চিঠি লিখেছেন। কিন্তু ছুটি পাননি বিদ্যাসাগর। সাথে সাথে চাকরি ছেড়ে উত্তাল দামোদর সাঁতরিয়ে মায়ের চিঠির মর্যাদা রেখেছেন। মাতৃভক্তির কারণে তিনি আরো মহান হয়েছেন। তার রচনাসমূহ অধিকাংশই সংস্কৃতি ভাষা থেকে অনূদিত। এগুলোর মধ্যে অন্যতম বিদ্যা পঞ্চবনস্পতি (১৮৪৭), বাংলার ইতিহাস (১৮৪৮), জীবন চরিত (১৮৫০), বোধোদয় (১৮৫১), উপাক্র মানিকা (১৮৫১) শতবস্তলা (১৮৪৫), বিধবা বিবাহ প্রস্তাব (১৮৯০)। এছাড়া শিশুদের জন্য রয়েছে: বর্ণপরিচয় (১ম ও দ্বিতীয় খণ্ড), ধারাপাত (১ম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধ্যায়), সংস্কৃতি উপক্রমিকা ব্যাকরণ এবং কুমুদি। মাত্র ৭১ বছর সময় পেয়েছিলেন। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তার কীর্তি যা নিজেকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহান এই বাক্যটি বিদ্যাসাগরের ক্ষেত্রে বদলে গিয়েছিল। এক্ষেত্রে তার কীর্তি মহান হয়ে উঠেছে। জীবনে তিনি দেড় শতাধিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। পিছিয়ে পড়া সাঁওতাল জনগোষ্ঠিকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক। হিন্দু সমাজের সতীদাহ প্রথাকে বাতিলের জন্য জোরদার সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। তীব্র আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ইংরেজ শাসকরা সতীদাহ বিলোপ আইন করতে বাধ্য হয়। এ সময় তার সঙ্গে রামতনু লাহিড়ীসহ আরো কয়েকজন যোগ দেন। এই ক্ষণজন্মা কীর্তিমান বাঙালি আদর্শ বাঁচাতে একসময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এই পরিবার-পরিজনহীন অবস্থায় ১৮৯১ সালের ২১ জুলাই তার কর্মময় জীবনের চির অবসান ঘটে।