আমার কথা

দীপংকর চক্রবর্তী

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০১৩, ১৯:০৫
আমার জন্ম দক্ষিণের এক ছোট্ট সুন্দর শহরে ১৯৫১ সালে। শহরটির নাম বরিশাল। ছায়াময়, নিরিবিলি চমত্কার একটি শহর। আমার বাবা শৈলেশ্বর চক্রবর্তী বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে গ্রন্থাগারিকের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি ইংরেজি পড়াতেন। আমার যা কিছু হয়ে ওঠার সব আমার বাবা এবং মা কুন্তি চক্রবর্তীর হাত ধরে। আমি যে কাজগুলো সামান্য পারি, তার মধ্যে লেখালেখি একটি। এ বিষয়ে আমার অনুপ্রেরণা ওরা দু’জন। পরবর্তী সময়ে আরও কারো কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে লেখালেখিতে আগ্রহ বেড়েছে। তেমনি একজন কবি রবীন সমদ্দার। আমাদের বাড়িতে বাবার একটা ছোটখাটো লাইব্রেরী ছিল। এনসাইক্লোপেডিয়া, ব্রিটানিকা থেকে শুরু করে নানা ধরনের বইয়ের একটি চমত্কার সংগ্রহ ছিল সেটি। আলমারি খুলে বই পড়ায় কোনো বাধা ছিল না বলে খুব অল্প বয়স থেকে যথেচ্ছ বই পড়েছি। অনেক বই আমার বয়সের উপযোগী ছিল না তাও পড়েছি। এতে ক্ষতি না হয়ে বরং অনেক উপকার হয়েছে, সেটা পরে বুঝতে পারি। এখান থেকে, এভাবে স্কুলের গন্ডি পেরোনোর অনেক আগে বাংলা সাহিত্যের প্রধান লেখকদের অনেক লেখাপড়া হয়ে যায় আমার। কখন লিখতে শুরু করেছি তা ঠিক মনে করতে পারব না। তবে খুব কম বয়স থেকে এটুকু মনে করতে পারি। তখন অবশ্য যা লিখতাম সবই গদ্য। চারপাশে যা দেখতাম তা নিয়ে কিছু লিখে ফেলতাম। সেটা না হত গল্প না হত প্রবন্ধ। অনেকটা এখনকার রিপোর্টাজ ধাঁচের লেখা। সেসব লেখা নিজগুণে হারিয়ে গিয়ে আমাকে অনেক লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়েছে। সম্ভবত ৬৬/৬৭ সালের দিকে কবিতা লিখতে শুরু করি। কাছাকাছি কোনো সময়ে স্কুলের বার্ষিকীতে আমার প্রথম লেখা ছাপা হয়েছিল বলে মনে পড়ে। এরপর লেখা ছাপা হয় সংবাদের খেলাঘর পাতায় এবং দৈনিক পয়গামের ছোটদের পাতায়। তারপর একসময় অনেক পত্রিকাতে লেখা ছাপা হয়েছে। কিন্তু আমার লেখালেখিতে টিকে যাবার পেছনে এই দু’টি পত্রিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। একই সময়ে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে কবিতা লিখতে শুরু করি। তবে আমার আগ্রহ সবসময় শিশু সাহিত্যের প্রতি ছিল। ছোটদের জন্য ছড়া, কবিতা এবং গল্প লিখেছি ৬৯/৭০-এর দিকে। দৈনিক পয়গামের ছোটদের পাতায় গল্প লিখে প্রথম পুরস্কার হিসেবে ছয় মাস বিনা পয়সায় পত্রিকা পেয়েছিলাম। সারাজীবনের লেখালেখিতে পুরস্কার বলতে ওই একটাই আমার স্মৃতিতে আছে। প্রথম লেখা ছাপা হবার অনুভূতি কেমন হয়েছিল মনে নেই। তবে নিশ্চয়ই খুব খুশি হয়েছিলাম। এখনও যখন কোথায়ও একটা লেখা ছাপা হয় তখন প্রথম লেখা ছাপা হবার মতোই আনন্দ উপভোগ করি। আমার প্রথম বই ‘উল্টোপুরান’ আমার সবচাইতে প্রিয় বই। ১৯৮২ সালে আমার ছোট ভাই ছড়াকার তপংকর চক্রবর্তীর উদ্যোগে বইটি প্রকাশিত হয়। এরপর সবমিলিয়ে গোটা ২৫ বই প্রকাশিত হলেও এই বইটি আমার সবচাইতে প্রিয় বই বলে আমি মনে করি। আবৃত্তি বিষয়ে বেশকিছু সংকলন আছে আমার। এর দুটি সংকলনে আবৃত্তি বিষয়ে যে অংশটুকু গদ্য আকারে লিখতে হয়েছে আমাকে পরবর্তী সময়ে সেই অংশটুকুর জন্য সারাদেশের আবৃত্তিকারদের কাছ থেকে আমি যেটুকু প্রশংসা পেয়েছি যেকোনো পুরস্কারপ্রাপ্তির চেয়ে তা আমার কাছে অনেক আনন্দের বলে মনে হয়। ছোটদের কিছু গল্পের নাট্যরূপ দিয়েছিলাম মঞ্চায়নের প্রয়োজনে, দুই একটা নাটক কিছুটা প্রশংসাও পেয়েছিল। কিন্তু তারপর আর নাটক লেখা হয়নি। এ নিয়ে কেনো বইও প্রকাশিত হয়নি। ছড়াকার এখলাস উদ্দিন আহমদের ক্রমাগত তাগিদের কারণে দৈনিক জনকণ্ঠে রম্য রচনা লিখেছিলাম বেশ কিছুদিন। লিটন ম্যাগাজিনে প্রচুর কবিতা লিখলেও কেন যেন কবিতার কোনো বই ছাপানোর আগ্রহ হয়নি কখনো। অসকার ওয়াইল্ডের দি হ্যাপি প্রিন্স বইটি অনুবাদ হয়ে বের হয়েছে গত বছর। এখনও কিছু গল্প এবং কবিতা অনুবাদ করছি। সরকারি কলেজে দীর্ঘদিন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে অধ্যাপনা করার পর এখন একটি দৈনিকে কাজ করছি।