টুম্পার জন্য উপহার

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০১৩, ১৯:০৬
টুম্পার নানু ভাইকে তার একদম পছন্দ না। উনি সবসময় উল্টো কাজ করেন। সব মানুষ থেকে উনি আলাদা। দেখা গেল কোন বিয়ের দাওয়াতে, সবাই শাড়ি, গয়না আর ডিনার সেট জাতীয় ব্যবহার্য উপহার নিয়ে হাজির। আর তার নানু ভাই মাথায় করে নানা রকমের গাছ-গাছালি নিয়ে হাজির। অনেকে তার দিকে কৌতূহল নিয়ে তাকাচ্ছে। কেউবা মুখ টিপে হাসছে। সেদিকে তাঁর কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। মনে হয় সবাই ভুল করেছেন। একমাত্র তিনিই ঠিক কাজটি করেছেন। কারো জন্মদিনে কমন উপহার বই। তিনি বই দেন আর বলেন, ‘এর চেয়ে মূল্যবান উপহার আর হয় না। একটি ভাল বই জীবনকে আমূল পরিবর্তন করে দিতে পারে। আল্লাহ জ্ঞানার্জন ফরজ করেছেন। বই সকল জ্ঞানের উত্স।’ এ কথা না হয় মানা গেল। কিন্তু গাছ উপহারের বিষয়টা কিছুতেই মানতে পারছে না টুম্পা। এ নিয়ে তার মার সাথে খুনসুটিও কম হয়নি টুম্পার। টুম্পার অভিযোগ, ‘তার নানুভাই টাকা বাঁচানোর জন্য এসব করেন।’ টুম্পার মা মিষ্টি করে হাসেন। গর্বভরে বলেন, ‘আমার বাবা চিন্তাশীল। সচেতন। সমাজ-সংসারের প্রতি দায়িত্বশীল’। আমরা গ্রামে বড় হয়েছি। গ্রামে ছিল বড় বড় গাছ। বড় বড় জলাশয়। খেলার মাঠ। দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ। আমরা প্রায় সারা বছর মাছ ধরে খেতাম। শাকসবজি আর ফলমূলের কোন অভাব ছিল না। ছয় ঋতুতে প্রকৃতি ছয় রূপ ধারণ করত। ছয় ঋতুর আগমন এবং চলে যাওয়া আমরা টের পেতাম। এখন শীত আর গ্রীষ্ম ছাড়া অন্য কোন ঋতুর উপস্থিতি টের পাওয়া যায় না। শীতের প্রভাবও আগের তুলনায় অনেক কম। মানুষের মধ্যে বিভিন্ন রোগ-শোক বেড়ে গেছে। এসব কেন হয়েছে জান? ভোগবাদী পৃথিবী শিল্পোন্নয়নের দিকে ধাবিত হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েই চলেছে। এর জন্য বিভিন্ন জ্বালানি পোড়ানো হচ্ছে। ফলে বাতাসে কার্বন-ডাই অক্সাইড বেড়ে যাচ্ছে। সবুজ গাছ আর বনভূমি উজাড় হয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক জলাধার, খাল-বিল, নদী-হাওর ভরাট হয়ে যাচ্ছে। গাছ ক্ষতিকর কার্বন-ডাই অক্সাইড শোষণ করে। গাছ কমে যাওয়াই কার্বন-ডাই অক্সাইড শোষণ কমে গেছে। ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা বেড়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে যাচ্ছে।’ কার্বন-ডাই অক্সাইড কীভাবে পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ায়? সূর্যের আলো পৃথিবীতে পড়ে তাপ বিকিরণ করে। কার্বন-ডাই অক্সাইড সেই তাপ আটকে রাখে। এভাবে উষ্ণতা বেড়ে যায়।’ টুম্পা ভয় পেয়ে গেল। ‘এভাবে উষ্ণতা বাড়তে থাকলে আমাদের কী হবে?’ তার মা বলল, ‘ভয়াবহ ব্যাপার ঘটে যেতে পারে। পৃথিবীর মেরু অঞ্চলে বিশাল পরিমাণ বরফ জমে আছে। উষ্ণতা বাড়লে সেই বরফ গলে যাবে। ফলে পৃথিবীর নিচু অঞ্চলে প্লাবিত হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে বাংলাদেশের গড় উচ্চতা মাত্র বিশ ফুট। সবার আগে তলিয়ে যাবে আমাদের দেশ। আমাদের এখনই সাবধান হতে হবে। সারাবিশ্বকে সাবধান করতে হবে। পরিবেশ দূষণ কমাতে হবে। বেশি করে গাছপালা লাগাতে হবে। এবার বুঝেছ, তোমার নানুভাই কেন গাছ উপহার দেয়? ‘টুম্পা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। মনে মনে ভাবল, নানুভাই অনেক বড় কাজ করে চলেছেন।’ টুম্পার পরীক্ষার রেজাল্ট হয়েছে। তিনশ’ ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে সে প্রথম হয়েছে। তার মা-বাবা খুব খুশি। বাড়িতে খুশির ঢল। অনেকেই নানা মিষ্টান্ন নিয়ে এসেছেন। তার নানুভাইকে খবরটা জানানো হয়েছে। তিনি এক মাটির হাঁড়ি নিয়ে উপস্থিত হলেন। হাঁড়ির মুখ কাগজ দিয়ে বাঁধা। সবাই ধরেই নিয়েছেন হাঁড়িতে মিষ্টান্ন। শুধু টুম্পার মনে হল, হাঁড়িতে কোন মিষ্টান্ন নেই। আমাদের জন্য কোন চমক অপেক্ষা করছে। টুম্পা খুব কৌতূহল নিয়ে হাঁড়ির ঢাকনা খুলল। খুলে দেখল, হাঁড়ি ভরতি পাকা তেঁতুল। টুম্পা খুনসুটি করে বলল, ‘দেখ মা, তোমার বাবা টাকা বাঁচানোর জন্য টক তেঁতুল নিয়ে এসেছে। মিষ্টি আনেনি।’ একথা শুনে তার নানুভাই মিষ্টি হেসে বলল, ‘টাকা বাঁচিয়ে যদি ভাল জিনিস উপহার দেয়া যায়, তাহলে তো খুবই ভালো। কোন খুশির সংবাদ শুনে মিষ্টি বিতরণ করা ফ্যাশন। আমরা এখান থেকে বের হতে পারি না। তোমার মা হাইপারটেনশনে ভুগছেন। তোমার বাবা ডায়াবেটিক রোগী। তাদের কারো জন্যই মিষ্টি ভালো নয়। তিনি ইউনানি চিকিত্সকের মতো বললেন, তেঁতুল পিত্তপ্রশমক, বমনরোধক। তাছাড়া উচ্চরক্তচাপ আর রক্তের কোলস্টেরল হ্রাসকারক। তেঁতুল রক্ত পরিষ্কার করে। এছাড়াও তেঁতুলের রয়েছে আরো অনেক ঔষধি গুণ— যা আমরা জানি না। অথচ তেঁতুল তোমরা কখনোই খাবে না। খাবে চকলেট আর বিভিন্ন ফাস্ট ফুড। আমরা এগুলো কখনোই খেতাম না। তাই আমরা এখনো এতো সুস্থ। আর পরীক্ষায় তোমার ভালো রেজাল্টের এই আমার উপহার।’