২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি, সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে পিলখানায় বিডিআর সদর দফতরের দরবার হলে শুরু হয় বিডিআর বিদ্রোহ। বাংলাদেশ রাইফেলস সপ্তাহ উপলক্ষে দরবার হলে বিডিআর মহাপরিচালক ও পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিডিআর সদস্যদের অনুষ্ঠিত দরবার থেকেই এ ঘটনার সূত্রপাত হয়।
সকাল ১০টা ২০ মিনিটে দরবার হলে একদল বিডিআর সদস্য আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করে। সেনা কর্মকর্তারা হাত তুলে দরবার হল থেকে বের হতেই গুলি করা হয়। প্রথমেই বিডিআর মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন। বাকি কর্মকর্তারা দরবার হলে প্রবেশ করেন। তারা আত্মরক্ষার্থে দরবার হলের বাথরুম, মঞ্চের গ্রিণ রুমসহ পর্দার আড়ালে আত্মগোপন করেন। কিন্তু বিডিআর সদস্যরা দরবার হলে খুঁজে খুঁজে সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করে। বিডিআর সদস্যরা অস্ত্রাগার লুট করে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তুলে নেয়।
পিলখানায় সেনা কর্মকর্তাদের কোয়ার্টারে হামলা চালিয়ে কর্মকর্তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আটক করে কোয়ার্টার গার্ডকে জিম্মি করে। প্রায় দেড় ঘন্টা পর পিলখানার আশপাশে পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি সেনাবাহিনী অবস্থান নেয়। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিদ্রোহীদের মধ্যে ১৪ বিডিআর সদস্যের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করেন। কিন্তু বিডিআর সদস্যরা আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারের একাধিক মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানগণ পিলখানায় ব্রিদোহী বিডিআর সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
রাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী পিলখানায় প্রবেশ করে বিডিআর সদস্যদের আগ্নেয়াস্ত্র জমা নেয়া শুরু করলেও আধঘন্টা পর আবারও বিডিআর সদস্যরা আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তুলে নেয়। রাত পোহালেই দেশের অন্যান্য ব্যাটালিয়নে বিডিআর সদস্যরা বিদ্রোহ করে। রাজশাহী, রংপুর, কুড়িগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি, সাতক্ষীরা, খুলনা, চট্টগ্রাম, সিলেট, নওগাঁ, যশোর, কুমিল্লাসহ বেশিরভাগ ব্যাটালিয়ন ও সেক্টরে বিডিআর সদস্যরা বিডিআর কর্মকর্তাদের (সেনা কর্মকর্তা) জিম্মি করে। পরদিন দুপুর ২টার দিকে শুরু হয় জিম্মি উদ্ধার। বেলা ৪টার দিকে পিলখানায় সেনা কর্মকর্তারা প্রবেশ করেন।
বিভীষিকাময় সেই দৃশ্য : প্রায় ৩৬ ঘন্টার এ বিদ্রোহের পর পিলখানা তৈরি হয় একটি মৃত্যুপুরীতে। শুধু রক্ত আর রক্ত। ব্যাটালিয়নের বিভিন্ন অফিস ভাংচুর করা হয়েছে। সেনা কর্মকর্তাদের কোয়ার্টারগুলো জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রথম দফায় কামরাঙ্গীরচরে একটি সুয়্যারেজ লাইন থেকে কয়েক দফায় ৯ সেনা কর্মকর্তার লাশ উদ্ধার করা হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি বিডিআর হাসপাতালের পেছনে একটি গণকবর থেকে উদ্ধার হয় ৩৯টি লাশ। এমটি গ্যারেজ মাঠের পাশে থেকে আরো একটি গণকবর থেকে উদ্ধার হয় ৯টি লাশ।
এ বিদ্রোহে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা, ১ জন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, ১ জন সৈনিক ও ২ জন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রীসহ মোট ৬১ জন নিহত হন। এছাড়া পিলখানায় সেনা কর্মকর্তাদের বাঁচাতে গিয়ে বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের বুলেটে প্রাণ হারান ৭ জন বিডিআর সদস্য। বিডিআর সদর দফতরের বিভিন্ন গেট থেকে ফাঁকা গুলি করায় আশপাশের আরো ৭ জন পথচারী নিহত হন।
নিহতরা হলেন মে. জে. শাকিল আহমেদ, তার স্ত্রী নাজনীন শাকিল শিপু, ব্রি. জে. জাকির হোসেন, ব্রি. জে. এমএ বারী, কর্নেল মজিবুল হক, কর্নেল আনিস উজ জামান, কর্নেল মসীউর রহমান, কর্নেল কুদরত ইলাহী রহমান শফিক, কর্নেল আখতার হোসেন, কর্নেল রেজাউল কবীর, কর্নেল নাফিজ উদ্দিন আহমেদ, কর্নেল কাজী এমদাদুল হক, কর্নেল বিএম জাহিদ হোসেন, কর্নেল সামসুল আরেফিন আহাম্মেদ, কর্নেল নকিবুর রহমান, কর্নেল কাজী মোয়াজ্জেম হোসেন, কর্নেল গুলজার উদ্দিন আহমেদ, কর্নেল শওকত ইমাম, কর্নেল এমদাদুল ইসলাম, কর্নেল আফতাবুল ইসলাম, লে.কর্নেল এনশাদ ইবন আমিন, লে. কর্নেল শামসুল আজম, লে. কর্নেল কাজী রবি রহমান, লে. কর্নেল গোলাম কিবরিয়া মোহাম্মদ নিয়ামতউল্লাহ, লে. কর্নেল বদরুল হুদা, লে. কর্নেল এলাহী মন্জুর চৌধুরী, লে. কর্নেল এনায়েতুল হক, লে. কর্নেল আবু মুছা মো. আইউব কাইসার, লে. কর্নেল সাইফুল ইসলাম, লে. কর্নেল লুত্ফর রহমান, লে কর্নেল সাজ্জাদুর রহমান, লে. কর্নেল লুত্ফর রহমান খান, মেজর মকবুল হোসেন, মেজর আব্দুস সালাম খান, মেজর হোসেন সোহেল শাহনেওয়াজ, মেজর কাজী মোছাদ্দেক হোসেন, মেজর আহমেদ আজিজুল হাকিম, মেজর মোহাম্মদ সালেহ, মেজর কাজী আশরাফ হোসেন, মেজর মাহমুদ হাসান, মেজর মুস্তাক মাহমুদ, মেজর মাহমুদুল হাসান, মেজর হুমায়ুন হায়দার, মেজর আজহারুল ইসলাম, মেজর হুমায়ুন কবীর সরকার, মেজর খালিদ হোসেন, মেজর মাহবুবুর রহমান, মেজর মিজানুর রহমান, মেজর মোহাম্মদ মাকসুম-উল-হাকিম, মেজর এস এম মামুনুর রহমান, মেজর রফিকুল ইসলাম, মেজর সৈয়দ মো. ইদ্রিস ইকবাল, মেজর আবু সৈয়দ গাযালী দস্তগীর, মেজর মুহাম্মদ মোশারফ হোসেন, মেজর মমিনুল ইসলাম সরকার, মেজর মোস্তফা আসাদুজ্জামান, মেজর তানভীর হায়দার নূর, ক্যাপ্টেন মাজহারুল হায়দার, লে.কর্নেল (অব.) দেলোয়ার হোসেন, তার স্ত্রী রৌশনী আক্তার হোসেন, সেন্ট্রাল সুবেদার মেজর নুরুল ইসলাম, সৈনিক জহিরুল ইসলাম, এডি খন্দকার আব্দুল আউয়াল, ডিএডি মাসুম খান, ডিএডি ফসিউদ্দিন, সুবেদার সহকারী আবুল কাশেম, নায়েক সহকারী বসির উদ্দিন, ল্যান্স নায়েক মানিক মিয়া, সিপাহী রুহুল আমিন, আয়া কল্পনা বেগম, মালি ফিরোজ মিয়া, ছাত্র তারেক আজিজ, রিকশা চালক আমজাদ আলী ও সবজি বিক্রেতা হূদয় মিয়া।
