দেশ হিসাবে পাকিস্তান নতুন হলেও এর ইতিহাস আর এর সামরিক অভ্যুত্থানের ইতিহাস অভিন্ন হয়ে উঠল। আব্বুর বয়স যখন আট, তখন জেনারেল জিয়াউল হক ক্ষমতা দখল করলেন। এখনো দেশের বিভিন্ন স্থানে তার ছবি দেখা যায়। তিনি ভীতু টাইপের লোক। তার দুই চোখের চারদিকে পাণ্ডার মত কালো ছোপ। দাঁতগুলো বড় বড়, দেখলে মনে হয় সেগুলোও অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চুল সব মাথার ওপর ল্যাপ্টানো। ক্ষমতা দখলের পর তিনি আমাদের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোকে গ্রেপ্তার করেন। বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে বিচার করে রাওয়ালপিণ্ডি কারাগারে তাকে ফাঁসিতে ঝোলান। এখনো লোকে বলাবলি করে যে, ভুট্টো খুব দক্ষ নেতা ছিলেন। তারা বলে, ভুট্টোই ছিলেন পাকিস্তানের প্রথম নেতা, যিনি দেশের সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করেছেন। যদিও তিনি ছিলেন, সামন্ত ভূস্বামী। আম চাষের বিশাল খামার ছিল তার। তাকে ফাঁসি দেয়ায় পাকিস্তানের সব মানুষই দুঃখ পেয়েছিল। বিশ্বেও পাকিস্তানের ভাবমূর্তি খারাপ হয়ে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সাহায্যদান বন্ধ করে দেয়।
দেশে জনসমর্থন আদায়ের জন্য জিয়াউল হক পাকিস্তানকে একটি যথার্থ মুসলিম দেশ করতে ইসলামিকরণের প্রচারণা শুরু করেন। একই সাথে তিনি এমন ধারণা দিতে চেয়েছিলেন যে, সেনাবাহিনীই হচ্ছে, ইসলাম ও দেশের রক্ষক। তিনি দেশের সাধারণ জনগণকে বললেন যে, সবার উচিত তার সরকারকে মেনে চলা কারণ, তার সরকার ইসলামি নীতি প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। এমনকি লোকে কিভাবে মোনাজাত করবে সে ব্যাপারেও নির্দেশনা দিতে চাইতেন তিনি। যে কারণে সালাত বা মোনাজাত কমিটি গঠন করা হল জেলায় জেলায়। এমনকি প্রত্যন্ত অজপাড়াগাঁও বাদ গেল না। এসব সালাত কমিটতে এক লাখ প্রশিক্ষকও নিয়োগ দেয়া হল। প্রশিক্ষকদের কাজ ছিল, কিভাবে মোনাজাত করতে হয় তাই লোকজনকে শেখানো। প্রথম প্রথম আব্বু বলতেন, কিচ্ছু হবে না। ওরা কয়েকদিন এ অনুষ্ঠান সে অনুষ্ঠানে ঘোরাঘুরি করবে তারপর সব থেমে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হল না। বরং তাদের প্রভাব অনেক বাড়তে লাগল। তাদেরকে ইসলামাবাদ নিয়ে গিয়েও ট্রেনিং দেয়া হতে লাগল। ট্রেনিংয়ের বিষয় ছিল, কিভাবে খুত্বা পাঠ করতে হবে, মোনাজাত করাতে হয়—ইত্যাদি। আমার দাদাকেও ট্রেনিং নিতে ইসলামাবাদ যেতে হল।
জিয়ার আমলে পাকিস্তানে নারীদের জীবন অত্যন্ত বিধিনিষেধের ঘেরাটোপে আটকা পড়ে গেল। এমনকি আদালতে একজন নারীর সাক্ষ্যকে পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেক বলে গণ্য করা হত। অর্থাত্ তখন এক জন পুরুষের সাক্ষ্যে সমান গুরুত্ব পেতে হলে দুইজন নারীকে সাক্ষ্য দিতে হত। যে কারণে জেলখানাগুলো ভরে গেল নারীতে। যেমন ১৩ বছরের এক ধর্ষিতা বালিকা অন্ত:সত্ত্বা হয়ে পড়লে তাকেই জেলে যেতে হয় অনৈতিক কাজের অভিযোগে। মেয়েটি দুইজন পুরুষ সাক্ষীর বিপরীতে চারজন নারী সাক্ষী জোগাড় করতে ব্যর্থ হয় বলেই দোষী সাব্যস্ত করা হয় তাকে। পুরুষের অনুমতি ছাড়া কোন মহিলা ব্যাংক একাউন্ট খুলতে পারতেন না। হকি খেলাতে পাকিস্তানের সুনাম আছে। কিন্তু জিয়া আমলে নারী খেলোয়াড়দের শর্টসের বদলে বেগি ট্রাউজার পরে মাঠে নামতে হত। শুধু হকি নয়, সমস্ত খেলাতেই নারী প্লেয়ারদের শর্টস পরা নিষিদ্ধ করা হয়।
