বেশি দামে ডলার কিনে রিজার্ভ বাড়াচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০১৩, ২২:৩৮
বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কিনে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াচ্ছে। ফলে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অন্যতম উত্স রেমিট্যান্স প্রবাহের ধারায় উল্টো গতি দেখা দিলেও রিজার্ভ বাড়ছেই। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, টাকার মূল্যমান ঠিক রাখতেই এ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। যদিও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই মুহূর্তে অপ্রয়োজনীয় হলেও ডলার কেনার কারণ মূলত দুটি। প্রথমত, রফতানিকারকদের বিশেষ করে গার্মেন্টস মালিকদের স্বার্থে টাকার মূল্যমান কমিয়ে রাখা হচ্ছে। একাজটি না করলে টাকার মান আরো বাড়তো এবং আমদানি পণ্যের খরচ কম হতো। তাতে ভোক্তারা কম মূল্যে পণ্য কিনতে পারতো। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের মুহূর্তে রিজার্ভকে বড় করে দেখানোর কৃতিত্ব। অথচ প্রকৃত অর্থে রিজার্ভকে বিনিয়োগযোগ্য না করে কেবল রাজনৈতিক বিবেচনায় রিজার্ভ বৃদ্ধি ঘটিয়ে সামগ্রিক অর্থনীতিতে কোন লাভ হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেবে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম মাস জুলাই থেকে গতকাল পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে ২১৮ কোটি ডলার। এর মধ্যে ১৮৫ কোটি ডলারই অন্যান্য ব্যাংক থেকে কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে ডলারের সঙ্গে টাকার মান ধরে রাখতেই বাংলাদেশ ব্যাংক এ কাজ করছে। গত ৩০ জুন ২০১৩ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ছিলো ১ হাজার ৫৩১ কোটি ডলার। গতকাল রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭৪৯ কোটি ডলারে। সে হিসেবে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে রিজার্ভ বেড়েছে ২১৮ কোটি ডলার। ব্যাংকগুলো থেকে ডলার কিনতে ডলার প্রতি ৭৮ টাকা ব্যয় করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক থেকে এভাবে ডলার না কিনলে প্রতি ডলার ৬৫ টাকায় চলে আসত বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। তাদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার সমৃদ্ধ হলেও এক্সচেঞ্জ লস বা বিনিময়জনিত ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে অর্থনীতি। প্রকৃত কার্যকর বিনিময় হারের তুলনায় ডলারের দাম বাড়িয়ে রাখা হচ্ছে। বাজার থেকে ডলার কেনা বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ এন্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কাজী ছাইদুর রহমান বলেন, গতবছরের শুরু থেকেই প্রবাসীরা প্রচুর পরিমাণে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধিও আগের যেকোন সময়ের তুলনায় ভাল। এ দুই কারণে বাজারে ডলার সরবরাহ অনেক বেড়েছে। তাই টাকার মান ধরে রাখতেই বাজার থেকে ডলার কেনা হচ্ছে। এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, আমদানি কমে যাওয়ায় রিজার্ভ বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়েছে তাতে বিনিয়োগ ও উত্পাদন আরো কমে যাবে। ফলে রিজার্ভ আরো বাড়বে। আর রিজার্ভ বাড়লেও তা কোন উপকারে আসছে না। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী তিন মাসের আমদানী ব্যয় মিটানোর মত রিজার্ভ থাকলেই হয়। কিন্তু বাংলাদেশে তার অনেক বেশি রয়েছে। এটা অর্থনৈতিক মন্দাভাবের বহিঃপ্রকাশ। এতে উত্ফুল্ল হবার কারণ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেশি থাকা অবশ্যই ভাল। তবে রিজার্ভ উত্পাদনশীল কাজে ব্যবহার করতে না পারলে তা তেমন লাভ পাওয়া যাবে না। আমাদের দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বড় উত্স হচ্ছে রেমিট্যান্স। কিন্তু রেমিট্যান্স যারা পাঠাচ্ছে তারা সেটাকে উত্পাদনমুখি কাজে না লাগিয়ে বাড়ি-ঘর তৈরি বা জমি কেনার কাজে ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা উত্পাদনমুখি কাজে না লাগিয়ে ভোগ্যপণ্যে ব্যবহার করায় মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সূচকের সর্বশেষ ধারা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রফতানি ছাড়া বেশিরভাগ সূচকের প্রবৃদ্ধিই কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করলেও বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের রাজস্ব আয় বেড়েছে। তবে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কম হওয়াতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারকে প্রচুর পরিমাণ ঋণ নিতে হয়েছে। যার বেশিরভাগই বিদ্যুত্-জ্বালানি খাতে ভর্তুকি হিসাবে গেছে। সরকারের বেশি ঋণের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের গতি কমেছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের (২০১৩-১৪) জুলাই-সেপ্টেম্বরে ঋণপত্র নিষ্পত্তি ভিত্তিক পণ্য আমদানি বেড়েছে ৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এ সময়ে ৮৭৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে। গত ২০১২-১৩ অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিলো ৮১৩ কোটি ৯৩ লাখ ডলার। অর্থাত্ চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৭০ কোটি ডলার। আর এ সময়ে রফতানি থেকে আয় হয়েছে ৭৬২ কোটি ডলার। যা এর আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩৩ কোটি ডলার বা ২১ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি। ২০১২-১৩ অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৬২৯ কোটি ডলার। আর চলতি বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে ৪৫০ কোটি ৪৬ লাখ ডলার এসেছে। আর গত বছরের একই সময়ে ৫০১ কোটি ২১ লাখ ডলার এসেছিল। এ তথ্য থেকে বোঝা যায়, রিজার্ভ বাড়ার পেছনে কেবল রফতানির অবদানই রয়েছে। আমদানি বা রেমিট্যান্সের তেমন কোন অবদান নেই।