বিডিআর বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে দায়েরকৃত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণ) আগামী দুই বছরের আগে শুনানি করাই সম্ভব হবে না। মামলার পেপার বুক তৈরি করতেই এ সময় লেগে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এডভোকেট এমকে রহমান। পেপার বুক তৈরির পরেও দ্রুত শুনানি নিয়েও জটিলতা রয়েছে। হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্সের শুনানি সালের ক্রম অনুসারে হয়ে থাকে। হাইকোর্টে এখন ২০০৮ সালের ডেথ রেফারেন্সের শুনানি চলছে। গত এক বছরে অর্ধশতের কিছু বেশি মামলা শুনানি হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৪২০টি মামলায় এক হাজার (বিডিআরের ১৫২ জন ব্যতীত) ফাঁসির আসামি মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে কারাগারের কনডেম সেলে অবস্থান করছে। গড়ে হাইকোর্টে বছরে ৫০ থেকে ৬০টি ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হয়ে থাকে। এ হিসেবে বিদ্যমান ডেথ রেফারেন্সের নিষ্পত্তি করতেই ৫ বছরের বেশি সময় লাগবে। ফলে স্বাভাবিক নিয়মে বিডিআর হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্সের শুনানি আগামী ৫ বছরের আগে শুরু করা সম্ভব হবে না। তবে সৌদি কর্মকর্তা খালাফ এস আল আলী হত্যার ডেথ রেফারেন্সের শুনানির ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলো। এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল বলেন, আলোচ্য ডেথ রেফারেন্সের ক্ষেত্রেও বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে দ্রুত শুনানি গ্রহণ সম্ভবপর হবে। কিন্তু সেটি কোনভাবেই দুই বছরের আগে সম্ভব নয়। কেন না পেপার বুক তৈরি করতে রাষ্ট্রের এই সময়টুকু লাগবে।
গত মঙ্গলবার ঢাকার একটি বিশেষ আদালত বিডিআরে কর্মরত ৫৭জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যার ঘটনায় ১৫২ জনকে ফাঁসির হুকুম দেন। কোন একটি মামলায় এত অধিকসংখ্যক ফাঁসির কোন নজির আমাদের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে নেই। সবদিক থেকেই এটি ছিলো একটি বিশাল কলবরের মামলা। এর আসামি সংখ্যা ছিলো ৮৫২ জন। আসামির সংখ্যার দিক থেকেও এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হত্যা মামলা। এই মামলার নথিও ৮৭ হাজার পৃষ্ঠার। ঘোষিত রায়টি ছিলো প্রায় ৪ হাজার পৃষ্ঠার। কোন মামলার ডেথ রেফারেন্স শুনানির আগে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিজি প্রেসে পেপার বুক তৈরি করা হয়। প্রতিটি মামলার জন্য প্রায় ১০ কপি করে পেপার বুক তৈরি করতে হয়। এ মামলায় ১৫২ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি আলাদা আলাদাভাবে আপিল দায়ের করে তাহলে পেপার বুকের সংখ্যাই হবে ১ হাজার ৫২০টি। নথি এবং রায় ইত্যাদি মিলিয়ে এর পৃষ্ঠার সংখ্যা হবে ৯০ হাজারের ওপরে। ফলে ৯০ হাজার পৃষ্ঠার ১ হাজার ৫২০টি পেপার বুক তৈরি করতে হবে। এটি শুধুমাত্র মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ক্ষেত্রে। অন্য দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা ৪২৩ জন। তাদের আপিলের শুনানিও একত্রে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেও পেপার বুক তৈরি করতে হবে। ফলে পেপার বুক তৈরি করা নিয়ে বিরাট জটিলতায় পড়তে হবে সংশ্লিষ্টদের। শুধু তাই নয় এই মামলার নথিপত্র আদালত কক্ষে আনা ও রাখা নিয়েও বেগ পেতে হবে।
বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ৪২০টি ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণ) মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব ডেথ রেফারেন্সের বিপরীতের ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের নিয়মিত ও জেল আপিল রয়েছে শুনানির অপেক্ষায়। হাইকোর্টের চারটি ডিভিশন বেঞ্চ বর্তমানে ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল নিষ্পত্তি করে থাকেন। এসব বেঞ্চে ২০০৮ সালে নিম্নআদালতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আপিল ও মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের মামলার শুনানি চলছে। সূত্র জানায়, ৪২০টি ডেথ রেফারেন্সের মামলার মধ্যে ২০০৮ সালের ৯৬টি, ২০০৯ সালের ৭৫টি, ২০১০ সালের ৭৪টি, ২০১১ সালের ৬৬টি, ২০১২ সালের ৬০টি ও চলতি বছরের ৫০টি বিচারাধীন রয়েছে। তবে ২০০৫ সালের একটি ডেথ রেফারেন্সের মামলা এখনো অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এডভোকেট এমকে রহমান বলেন, পর্যায়ক্রমে ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি হচ্ছে। শুনানির আগে তো পেপার বুক প্রস্তুত করতে হবে। ক্রমানুসারে পেপার বুক তৈরি করতে একটু সময় বেশি লাগছে। এরপর তালিকায় আসলে শুনানি শুরু হয়। তিনি বলেন, এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতি প্রয়োজন মনে করলে আরো বেঞ্চ বাড়াতে পারেন। দক্ষ ও যোগ্য বিচারক নিয়ে বেঞ্চ গঠন করা প্রয়োজন। পেপার বুক তৈরি হলে বিশেষ ব্যবস্থায় শুনানি শুরু করার আবেদন আমরা হাইকোর্টে জানাবো। এম কে রহমান বলেন, কনডেম সেলে ফাঁসির আসামিরা মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। তাদের অধিকার রয়েছে যাতে দ্রুত এসব মামলার বিচার শেষ হয়। কারণ যত দ্রুত নিষ্পত্তি হবে ততই মঙ্গল।
পিলখানা হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট শেখ বাহারুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, রায়ের সত্যায়িত কপি প্রাপ্তির সাত দিনের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদেরকে আপিল করতে হবে। আর যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিতদের আপিল করতে হবে ৬০ দিনের মধ্যে। তিনি বলেন, ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানির জন্য পেপার বুক প্রস্তুত করবে বিজি প্রেস। সাধারণ নিয়মে পেপার বুক প্রস্তুত করে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শুরু করতে কমপক্ষে দুই বছর লেগে যায়। তবে প্রধান বিচারপতি যদি চান বিশেষ বেঞ্চে শুনানি হবে তাহলে তা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।
