সহিংসতার আগুনে পুড়ে শেষ পর্যন্ত মারা গেল গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মনির হোসেন মনু (১৪)। তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মৃত্যু বরণ করেন তিনি।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রকল্প পরিচালক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, মনিরের দেহের ৯৫ ভাগই পুড়ে গেছে। তার খাদ্য নালী পুড়ে গিয়েছিল।
নিহত মনিরের বাবা রমজান আলী পেশায় কাভার্ড ভ্যান চালক। গত সোমবার ১৮ দলীয় জোটের হরতালের প্রথম দিনে দুর্বৃত্তরা তার বাবার কাভার্ড ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে কাভার্ড ভ্যানের ভেতর আটকে পড়া মনিরের প্রায় সারা শরীর পুড়ে যায়। পুলিশের সহায়তায় অ্যাম্বুলেন্স যোগে মনিরকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ময়না তদন্ত শেষে গতকাল বিকালে মনিরের মৃতদেহ কালিয়াকৈর উপজেলায় বড় কাঞ্চনপুর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। মৃতদেহ সেখানে পৌঁছলে এক মর্মস্পশী পরিবেশ তৈরি হয়।
মনিরের মা মনোয়ারা বেগম কফিন ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, বাবারে ঢাকা শহর দেখার শখ ছিল। তুই গেলি ঠিকই কিন্তু ফিরলি লাশ হয়ে। মনিরের বাবা রমজান আলী বলেন, ঢাকায় নেয়ার জন্য ছেলে বায়না ধরেছিল। হরতালের আগের দিন অর্থাত্ রবিবার রাতে ছেলেকে পাশে বসিয়ে ঢাকা ঘুরিয়ে দেখাই। রাত তিনটার দিকে ভ্যানে মাল তুলে গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা হই। কিছুক্ষণ পর ছেলে ঘুমিয়ে পড়ে। ভোরে গাজীপুর চৌরাস্তার কাছে ভ্যান থেকে মাল নামিয়ে চৌরাস্তায় গাড়িটি পার্ক করি। ভ্যানের পাশেই ছিল বেশ কয়েকজন পুলিশ। পাশের একটা হোটেলে দুজনে নাস্তা খাই। পুলিশ দেখে ভরসা পেয়ে ছেলেকে ঘুমে রেখে একটু সামনে যাই। কিছু দূর যাওয়া মাত্রই দেখি ভ্যানটি দাউদাউ করে জ্বলছে। দৌড়ে ভ্যানের কাছে এসে দেখি আমার ছেলের গা আগুনে পুড়ছে। মনির লাফিয়ে ভ্যান থেকে নামে। আশেপাশের লোকজন পানি ছিটিয়ে শরীরের আগুন নেভান।
মনিরের মৃত্যুর খবর পেয়ে সকালেই স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আ.ক.ম মোজাম্মেল হক, চাপাইর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাইফুজ্জামান সেতুসহ আত্মীয়-স্বজনরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান। স্থানীয়রা জানান, মনির বড় কাঞ্চনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। বছর তিনেক আগে রমজান আলী তার মেজ মেয়ে মুক্তাকে সড়ক দুর্ঘটনায় হারান। লিখন নামে তিন বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে তার।
গতকাল মনিরের বাড়িতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ হাজার হাজার গ্রামবাসী যায়। বাদ আসর নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে মনিরকে দাফন করা হয়। এদিকে কাভার্ড ভ্যানে আগুন ও চালকের ছেলের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়ার ঘটনায় গাজীপুর সদর থানার এসআই হাফিজুর রহমান বাদী ওই দিনই একটি মামলা দায়ের করে। জেলা যুবদল নেতা শওকত হোসেন বাবুকে প্রধান আসামি করে বিএনপি-জামায়াতের ৮৪ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে এ মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশ এ মামলার ৭ জন এজাহারভুক্ত আসামিসহ ১২ জনকে গ্রেফতার করেছে। গাজীপুর প্রতিনিধি ও কালিয়াকৈর সংবাদদাতা প্রতিবেদন তৈরিতে সাহায্য করেছেন।
