কেউ বিলাপ করতে করতে কবরের ওপর আঁচড়ে পড়ছেন, কেউ নির্বাক বসে আছেন কবর ছুঁয়ে, কেউবা স্বজনের কবরের পাশে বসে একমনে প্রার্থনা করছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার এই ছিল জুরাইন কবরস্থানের দৃশ্য। সাভারে রানা প্লাজা ধ্বংসের পর ডিএনএ টেষ্টের মাধ্যমে শনাক্তকৃত ১৫৭ শ্রমিকের মধ্যে নিহত ৩০ জন শ্রমিকের পরিবার খুঁজে পান তাদের স্বজনের কবর। সাড়ে ছয় মাস পর স্বজনের কবরের সন্ধান পেয়ে এক মর্মস্পর্শী দৃশ্যের অবতারণা হয় জুরাইন কবরস্থানে। উল্লেখ্য, বেওয়ারিশ হিসাবে জুরাইন কবরস্থানে ৩২২ শ্রমিকের লাশ দাফন করা হয়।
রানা প্লাজা ধসের পর নিহত মর্জিনার বাবা সফির উদ্দিন মেয়ের কবরের সন্ধান পেয়ে অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়ে যান। প্রখর রোদের মধ্যে তিনি কবরের পাশে বসে থাকেন। তিনি জানান, আল্লাহর কাছে তার আর কিছু চাওয়ার নেই। কোন ধন সম্পদেরও দরকার নেই তার। সরকারের কাছেও তার কিছু চাওয়ার নেই। মেয়ের কবরের সন্ধান পেয়েছেন এটিই তার জীবনের সবচে বড় পাওয়া। ভবন ধসের ঘটনায় তার আরেক মেয়ে রোজিনাও গুরুতর আহত হয়। রোজিনার বাম হাত কেটে উদ্ধারকর্মীরা তাকে উদ্ধার করেন।
শাফিনুর বেগম অনেকক্ষণ ধরে খুঁজছিলেন কোন কবরটি তার মেয়ের কবর। বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি সংগঠনের নেতারা ডিএনএ নমুনা থেকে প্রাপ্ত নম্বর ও কবরে উল্লেখ করা নম্বরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখিয়ে দিলেন, এটিই তার মেয়ের কবর। মুহূর্তের মধ্যে শাফিনুর কবরের মধ্যে আঁচড়ে পড়লেন। ‘আমার পাখিরে তুমি দেইখা রাইখো..’ বলে মেয়ের কবর ছুঁয়ে গড়াগড়ি করতে লাগলেন। সেখানে অন্যরা তাকে নিবৃত করার চেষ্টা করলেও সন্তানহারা ঐ মায়ের চিত্কারে তখন জুরাইন কবরস্থানে এক হূদয়স্পর্শী ঘটনার সৃষ্টি হয়। ডিএনএ টেষ্টের মাধ্যমে কবর শনাক্ত হলেও নির্ধারিত কবরটি (কবর নং-৮) খুঁজে না পেয়ে পাগলের মত প্রলাপ বকতে থাকেন নিহত শহিদুলের স্ত্রী খাদিজা। কবরস্থান কর্তৃপক্ষও ৮ নম্বর কবরটি খুঁজে পাননি।
গতকাল সাভার থেকে নিখোঁজ ৪০টি পরিবারকে জুরাইন কবরস্থানে নিয়ে আসেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি নামের একটি সংগঠন। সংগঠনটির সাভার অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাসেল জানান, ডিএনএ টেষ্টে শনাক্তকৃত ১৫৭ জন নিখোঁজ শ্রমিকের মধ্যে ৪০টি পরিবারকে তারা জুরাইন কবরস্থানে নিয়ে এসেছেন। এর মধ্যে ৩০টি পরিবার তাদের স্বজনের কবর খুঁজে পেয়েছেন।
তিনি জানান, নিখোঁজ ৫৭০ জন শ্রমিকের স্বজনদের ডিএনএ টেষ্টের জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে একই নাম একাধিকবার আসায় সেখান থেকে বাছাই করে ৩২২ জনের সংশোধিত তালিকা প্রকাশ করা হয়। কিন্তু জুরাইন কবরস্থানে দাফন দেখানো হয়েছে ২৯১ জনকে। তিনি আরো জানান, স্বজনদের দাবি নিখোঁজ ৫৪০ জন। সরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ৩৭৯ জন।
