দেশে বর্তমানে ৩৪টি সরকারি তথা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৭৭টি প্রাইভেট অর্থাত্ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স, মাস্টার্স, এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতি বছর সমাবর্তন হয়। যদিও আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশকে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করা চলে না, তথাপি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তো অবশ্যই বিশ্বমানের হওয়া উচিত। অন্যথায় ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দটির তাত্পর্য ও গুরুত্ব কমে যাবে।
আমাদের দেশের শীর্ষবিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (যাকে এক সময় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হতো) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে। হিসেব অনুয়ায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পর্যন্ত সমাবর্তন হওয়ার কথা ৯২ বার। কিন্তু হয়েছে ৪৭ বার। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৩ সালে। হিসেব অনুযায়ী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পর্যন্ত ৬০ বার সমাবর্তন হওয়ার কথা থাকলেও সমাবর্তন হয়েছে মাত্র আটবার। ১৯৭০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এ পর্যন্ত ৪৩ বার সমাবর্তন হওয়ার কথা থাকলেও হয়েছে মাত্র পাঁচবার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। হিসেব অনুযায়ী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৭ বার সমাবর্তন হওয়ার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত সমাবর্তন হয়েছে মাত্র তিনবার। দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালেও ঠিক একই ধরনের চিত্র পরিলক্ষিত হবে। দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পর্যন্ত ১৬ বার সমাবর্তন হয়েছে, যদিও ২১ বার সমাবর্তন হওয়ার কথা ছিল। প্রথমবারের মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হওয়ার পরের বছর অর্থাত্ ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পর্যন্ত ২০ বার সমাবর্তন হওয়ার কথা থাকলেও হয়েছে ১৪ বার। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়। যদিও এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ বার সমাবর্তন হওয়ার কথা ছিল কিন্তু হয়েছে আটবার। ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এখানে এ পর্যন্ত ১৭ বার সমাবর্তন হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত সমাবর্তন হয়েছে ১২ বার। সমাবর্তনের বিষয়ে দেশের অন্যান্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রও ঠিক এরকম বা এর চেয়ে কিছুটা কম। তবে সমাবর্তনের পরিসংখ্যানগত দিক থেকে বলা যায় যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায় বেসরকারি বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তুলনামূলকভাবে সমাবর্তনের আয়োজনের দিক থেকে বেশ অনেকাংশেই এগিয়ে রয়েছে।
সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউট থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে মূল সনদপত্র দেওয়া হয়। তাছাড়া সমাবর্তনের ফলে বিভিন্ন গুণীজনেরও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আগমন ঘটে। আর শিক্ষার্থীরাও তাঁদের সঙ্গে মিলনমেলায় অংশ নিতে পারে। এসব কিছুর মধ্য দিয়েই শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি ঘটে। সমাবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীদের জীবনে রচিত হয় নতুন এক আনন্দময় স্মৃতি। তাছাড়া প্রতিবছর সমাবর্তন হলে শিক্ষার্থীরা যথাসময়ে বের হয়ে চাকরিসহ অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে যোগদানও করতে পারে। কিন্তু যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে ও নিয়মিতভাবে সমাবর্তন হয় না, সেইসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে যাওয়া শিক্ষার্থীরা এসব আনন্দ-উত্সব, মিলনমেলা, স্মৃতি ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। পাশাপাশি যেসব শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরের দেশে যেতে আগ্রহী, তাঁরা পড়ে চরম বিড়ম্বনায়। কারণ বাইরের দেশগুলোর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষার জন্য মূল সনদপত্র চাওয়া হয়ে থাকে।
সমাবর্তন হচ্ছে বিদ্যায়তনিক সংস্কৃতির অনিবার্য অংশ এবং একইসঙ্গে তা ওই বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সকলের জন্য বড় একটি আনুষ্ঠানিক যজ্ঞ। প্রতিবছর সমাবর্তন করা না হলে বিশ্ববিদ্যালয় যে তার নিজস্ব মর্যাদা বহন করে থাকে তা আর থাকে না। তাছাড়া সমাবর্তনের মাধ্যমে সনদপত্র দিতে না পারলে একজন শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনও পরিপূর্ণরূপে শেষ হয় না। তাই শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের পরিপূর্ণ সমাপ্তি ঘটাতে প্রতিবছরই সমাবর্তন করার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, সরকার তথা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকলেরই নজর দেওয়া উচিত।
ঢাকা
