শ্রমিক কমিটি বাতিলের জের ধরে খায়রুল মোল্লা খুন

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০১৩, ২২:৪৯
বৃহত্তর কিশোরগঞ্জ শ্রমিক কমিটি বাতিল নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে মতিঝিলের সমবায় ব্যাংক ভবনে আওয়ামী লীগ নেতা ও পরিবহন ব্যবসায়ী খায়রুল আলম মোল্লা খুন হয়েছেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সায়দাবাদ বাস টার্মিনালের বৃহত্তর কিশোরগঞ্জ শ্রমিক কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক তৈয়ব আলী, তার সহযোগী আমজাদ হোসেন, সমবায় ব্যাংকের নিরাপত্তা কর্মী নূরুল হক, শুভ সাহাসহ ৭ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া এ্যান্ড কমিউনিকেশন শাখার উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে ময়না তদন্তশেষে নিহতের ভাই আনোয়ারুল আলম লাশ গ্রহণ করেন। তবে নিহতের মেয়ে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী হওয়ায় তার লাশ বারডেম হিমঘরে রাখা হয়েছে। নিহত খায়রুল মোল্লার দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর ২৪৩/এ নম্বর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এলাকাবাসী, দলীয় নেতাকর্মী ও স্বজনদের ভীড়। নিহতের স্ত্রী শেফালী আলমসহ স্বজনরা চিত্কার করে কাঁদছেন। পুলিশের মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মেহেদী হাসান জানান, খুনের ঘটনার পর শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত থানায় কোন মামলা হয়নি। তবে পুলিশ মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান জানান, ঘটনা তদন্তে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন অতিরিক্ত উপ-কমিশনারের নেতৃত্বে একটি টিম মাঠে নেমেছে। ডিবির সূত্র জানায়, ঘটনার পর রাতেই ডিবি তৈয়ব আলী ও আমজাদসহ ৭ জনকে আটক করে। খুনের আগে সমবায় ভবনের তৃতীয় তলায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান মহীউদ্দীন মহী, ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল শ্রমিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আলী আজগর বাবুল, সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খায়রুল আলম মোল্লা, বৃহত্তর কিশোরগঞ্জ শ্রমিক কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক তৈয়ব আলী ও মহীউদ্দীন মহীর নিকট আত্মীয় আওয়ামী লীগ নেতা বায়ু এই ৫ জনের মধ্যে একটি বৈঠক হয়। এর আগে ১৯৯৬ সালে সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল শ্রমিক কমিটি সভাপতি ছিলেন মহীউদ্দীন মহী। ঐ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন খায়রুল আলম মোল্লা। ঐ সময় থেকেই মহী ও খায়রুলের মধ্যে গভীর সখ্য। বর্তমানে খায়রুল সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। খায়রুলের ঢাকা-লাকসাম রুটে ‘তিশা পরিবহন’ কোম্পানিতে ৩টি বাস রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মজনু মোল্লাকে সভাপতি ও তৈয়ব মোল্লাকে সাধারণ সম্পাদক করে সায়দাবাদ বাস টার্মিনালের বৃহত্তর কিশোরগঞ্জ শ্রমিক কমিটির পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপরই সায়দাবাদ বাস টার্মিনালে বাস পার্কিং করার টোল আদায় নিয়ে খায়রুলের সাথে তৈয়ব আলীর দ্বন্দ্ব হয়। টার্মিনালের বৃহত্তর কিশোরগঞ্জ শ্রমিক কমিটির পূর্ণাঙ্গ কমিটির ঘোষণার একমাসের মাথায় ঐ কমিটি বাতিল করা হয়। এসময় তৈয়ব আলী অভিযোগ করেন, এই কমিটি বাতিলের পিছনে খায়রুল মোল্লার হাত রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তৈয়ব আলী কয়েকবার তাদের নেতা মহীউদ্দীন মহীর কাছে অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি মীমাংসা করার জন্যই বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সমবায় ভবনে বৈঠকে বসেন তারা। এ বৈঠক থেকে বের হয়ে তৃতীয় তলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় দ্বিতীয় তলায় অজ্ঞাত সন্ত্রাসীরা ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। নিহতের গাড়িচালক আবুল কালাম জানান, শুক্রবার বিকাল ৪টার দিকে তার মালিক খায়রুল আলম মোল্লা জয়কালীর মন্দিরের কাছে পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন অফিস থেকে সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দফতরে যান। এর ২০-২৫ মিনিট পরেই ৪-৫ জন যুবকসহ তৈয়ব আলী যান সেখানে। তারা মোটরসাইকেলে করে আসে। ৫টার দিকে তার গাড়ির মালিক তাকে ফোন করে গাড়ি বের করে মধুমিতা সিনেমা হলের পিছনে আশেকে রসুল গ্যারেজে নিয়ে যেতে বলেন। সেখানে পৌঁছামাত্রই খায়রুল আলম আবার ফোন দিলেও কোনো কথা বলেননি। এসময় ফোনে শুধু ধর ধর ও চেঁচামেচি শোনা যায়। লাইন কেটে দিয়ে আবার ফোন করলেও তিনি ধরেননি। নিহতের স্ত্রী শেফালী আলম জানান, সায়দাবাদ বাস টার্মিনালে একটি রুটের গাড়ির প্রায় ১৬ লাখ টাকার টোল আদায়ের কাজ পান তার স্বামী। এ নিয়ে টার্মিনালের পরিবহন নেতা আবুল কালাম এবং খায়রুলের বন্ধু যুবলীগ নেতা তৈয়ব আলীর সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয়। গত রোজার ঈদের পরে তারা সপরিবারে মালয়েশিয়া বেড়াতে গেলে তৈয়ব আলী তার স্বামীকে মোবাইল ফোনে কয়েক দফা হুমকি দেয়। এক সপ্তাহ পরে দেশে ফিরে আসলে তাদের সঙ্গে ঝামেলা তৈরি হয়। তবে সপ্তাহখানেক ধরে কোনো উচ্চবাচ্য ছিল না। তিনি জানান, ঘটনার দিন টোলের বিষয় নিয়ে মহীউদ্দীন মহী তার দফতরে খায়রুল, তৈয়ব আলী, আলী আসগর বাবুল ও যুবলীগের কর্মীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। তিনি অভিযোগ করেন, টোলের নিয়ন্ত্রণ নিতে তৈয়ব আলীকে দিয়ে কালাম তার স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে খুন করিয়েছে। এছাড়া বাবুলসহ আরো অনেকে জড়িত। কারণ ঘটনার সময় বাবুল উপস্থিত থাকলেও তার স্বামীকে বাঁচাতে এগিয়ে যায়নি।