সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী উপজেলার যমুনার দুর্গম একটি চরের নাম মুরাদপুর। প্রত্যন্ত এই চরটি জেলা শহর থেকে প্রায় ৬০ কি:মি: দূরে অবস্থিত। অভাব, দারিদ্র্য আর বেকারত্ব এখানকার মানুষের নিত্যসঙ্গী ছিল। অবশ্য এই গল্পটা ২০১১ সালের আগের। এখনকার চিত্র বেশ ভিন্ন। এই গ্রামের ১০ জন সংগ্রামী নারী চরটিকে পাল্টে দিয়েছেন মাত্র তিন বছরে। তারা মোজা তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠা করে দূর করেছেন নিজেদের বেকারত্ব, জীবনে বয়ে এনেছেন সফলতা আর সংসারে এনেছেন স্বচ্ছলতা। আর এর সবটুকুই সম্ভব হয়েছে তাদের একনিষ্ঠ শ্রম ও প্রচেষ্টায়। তবে তাদের পথ দেখিয়েছে স্থানীয় একটি এনজিও।
জানা গেছে, মানবমুক্তি সংস্থা বিদেশি দাতা গোষ্ঠী অক্সফাম জিবি’র আর্থিক সহযোগিতায় রি-কল প্রকল্পের মাধ্যমে মুরাদপুর গ্রামের ১০ নারীকে মোজা তৈরির কাজে প্রশিক্ষণ দেয়। তারপর তাদের প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে পুঁজি সরবরাহ করে একটি করে মোজা তৈরির মেশিন কেনার জন্য। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঐসব নারী ওই টাকার সাথে আরো কিছু টাকা যোগান দিয়ে একযোগে ১০টি মোজা তৈরির মেশিন ক্রয় করেন। পরে তা স্থাপন করা হয় ভাড়া করা একটি ঘরে। তৈরি হতে থাকে পায়ে পরার মোজা। মাস শেষে তারা তা সরবরাহ করে ঢাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন শহরের দোকানে। খুব অল্প সময়েই তাদের মোজার কদর তৈরি হয় ব্যবসায়ীদের কাছে। তারা নগদ অর্থ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করতে থাকেন ঐ ১০ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে। ধীরে ধীরে প্রসার ঘটতে থাকে তাদের ব্যবসায়। তাদের তৈরি মোজার চাহিদাও বাড়তে থাকে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায়। বর্তমানে ওই মোজা তৈরির কারখায় প্রায় ২০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। এর মধ্যে স্বামী পরিত্যক্তা ও স্কুল পড়ুয়া ছাত্রীও রয়েছে। তাদের প্রত্যেকের অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রতিদিন ওই কারখানায় তৈরি হয় প্রায় তিন শতাধিক মোজা। আর এই মোজা বিক্রির টাকায় চলে ঐসব খেটে খাওয়া নারীদের সংসার। চলে অনেকের পড়াশোনার খরচ।
ঐ দশ নারীর পক্ষে মুরাদপুর চরের আব্দুল¬াহ মুন্সীর স্ত্রী বিমলা খাতুন (২৫), নুর মোহাম্মাদের কন্যা নুরুননাহার বেগম (২০) বলেন, এক সময় তারা দারিদ্র্যপীড়িত জীবন-যাপন করতেন। কিন্তু মোজা তৈরির কারখানা তাদের সবার ভাগ্যের পরিবর্তন করেছে। এখন আর অভাব-অনটনের সাথে নিত্য লড়াই করতে হয় না।
মোজা কারখানার নারী শ্রমিক স্থানীয় চরদ্বীপপুর বানতিয়ার উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম ছাত্রী শোভা খাতুন জানায়, সে তার পড়াশোনার ফাঁকে ঐ মোজা তৈরির কারখানায় কাজ করে। যে টাকা আয় হয় তা দিয়ে তার পড়াশোনার খরচ চলে।
মানবমুক্তি সংস্থার পরিচালক হাবিবুল¬াহ বাহার এবং উপ-পরিচালক এসএম আমির হোসেন এ প্রসঙ্গে ইত্তেফাককে বলেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মোজা তৈরির কারখানা স্থাপন করে মুরাদপুর চরের নারীরা যেমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তেমনি দূর করেছেন অভাব ও বেকারত্ব। তাদের দেখে আশেপাশের এলাকার অনেক নারীই এখন স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
