আমরা পশতুনরা পাকিস্তান ও আফগানিস্তান দিয়ে দুইভাগে ভাগ হয়ে পড়েছি। তবে বাস্তবতা হল, একশ’ বছর আগে ব্রিটিশরা এই যে সীমান্ত বানিয়ে আমাদের দুইভাগে ভাগ করে রেখে গেছে, সেই সীমান্তটাকে আমরা মনে মনে মানি না। সুতরাং আফগানিস্তানে যখন সোভিয়েত বাহিনী প্রবেশ করল, তখন পাকিস্তানে বসে পশতুনদের রক্তও টগবগিয়ে ফুটেছে ক্ষোভে। মসজিদের ইমামগণ ধর্মীয় উপদেশ দেয়ার সময় প্রায়ই আফগানিস্তানে সোভিয়েত সেনাবাহিনীর অনুপ্রবেশ নিয়ে কথা বলতেন। তারা নাস্তিক রুশ বাহিনীর নিন্দা করতেন এবং তাদের বিরুদ্ধে জেহাদে যোগ দেয়ার জন্য সাধারণ জনগণের প্রতি আহ্বান জানাতেন। তারা বলতেন, এই যুদ্ধে যোগ দেয়া প্রতিটি মুসলমানের পবিত্র কর্তব্য। জেনারেল জিয়ার আমলে এই জিহাদ যেন ইসলামের ষষ্ঠ স্তম্ভে পরিণত হল। আমাদের ধারণা অনুযায়ী কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ্ব ও যাকাত হল ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ। আব্বু বলেন, সিআইএ আমাদেরকে এই জিহাদে খুব অনুপ্রাণীত করত। শরণার্থী শিবিরগুলোতে শিশুদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বই বিতরণ করা হল। এসব বইয়ে প্রাথমিক গণিত শেখানো হত যুদ্ধের মাধ্যমে। যেমন, একটা উদাহরণে বলা হয়েছে, ‘যদি ১০ জন নাস্তিক রুশ সৈন্যের মধ্যে ৫ জনকে একজন মুজাহিদ হত্যা করে তবে আরো ৫ জন নাস্তিক রুশ সৈন্য বাকি থাকে’। আবার যেমন, ‘১৫ ব্যুলেট বিয়োগ ১০ ব্যুলেট সমান ৫ ব্যুলেট।
আমার আব্বুর এলাকা থেকেও বেশ কিছু ছেলে যুদ্ধ করতে আফগানিস্তানে গিয়েছিল। আব্বু বলেন, একদিন সুফি মোহাম্মদ নামে এক মওলানা আমাদের গ্রামে এসে তরুণদের মুজাহিদ বাহিনীতে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান। অনেকেই তাতে যোগ দেয়। যারা তাতে যোগ দিয়েছিল, তাদের হাতে সেকেলে রাইফেল বা কুড়াল তুলে দিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয় আফগানিস্তানে। তখন কোন কোন মওলানা তাদের প্রতিষ্ঠানকে সোয়াত তালেবানে পরিণত করেছিলেন। তখন আমার আব্বুর বয়স মাত্র বারো, তখনো যুদ্ধে যাওয়ার মত বয়স হয়নি তার। সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তানে ছিল দশ বছর। আব্বুর যখন যুদ্ধে যাওয়ার মত বয়স হল, তখন তিনি জিহাদে যোগ দিতে আফগানিস্তান যেতে চেয়েছিলেন। তবে তিনি এসময় দূরের এক গাঁয়ের এক মসজিদে গিয়ে একজন সিনিয়র শিক্ষার্থীর সঙ্গে পবিত্র কোরআন শিখতে শুরু করেন। তারা সেখানে তিরিশ পারা কোরআন অধ্যয়ন করতেন।
সেই সিনিয়র ছাত্র জিহাদ একজন মানুষের জীবনে যে কত বড় সুযোগ, সেটা নানাভাবে বোঝাতেন। তিনি আব্বুকে বোঝাতেন, পৃথিবীতে মানুষের জীবন খুব ছোট। এই ছোট্ট জীবনে জিহাদে যাওয়ার মত সুযোগ বারবার আসে না। গ্রামে আমাদের পরিবারের ছোট্ট এক খণ্ড জমি ছিল। আব্বুর সহপাঠীদের বেশিরভাগই যেতেন দক্ষিণে কয়লার খনিতে কাজ করতে। কিন্তু আব্বুর সেটা মোটেও ভালোলাগত না। তার ইচ্ছাও ছিল না কয়লা খনিতে কাজ করার। কয়লা খনির কাজ অত্যন্ত বিপজ্জনক। সেখানে দুর্ঘটনায় নিহতদের লাশ আসত কফিনে করে। বছরে কয়েকবার করে আসত সেসব লাশ। তবে গ্রামের অধিকাংশ যুবকের স্বপ্ন ছিল সৌদি আরব বা দুবাইয়ে গিয়ে নির্মাণ শ্রমিক হিসাবে কাজ করা। সুতরাং শহীদ হলে বেহেস্তে গিয়ে ৭২ হুর পাওয়ার লোভ সামলানো এসব তরুণদের জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। আব্বুতো প্রতিরাতেই আল্লাহ্তা’লার কাছে মোনাজাত করতেন, ‘হে আল্লাহ্! নাস্তিক আর মুসলমানদের মধ্যে যুদ্ধ লাগিয়ে দাও, যাতে আমি শহীদ হতে পারি।’
তখন সবে আব্বুর মুখে দাড়ি গোঁফের রেখা ফুটেছে। তখন মুসলমান পরিচয়টা হঠাত্ করেই তার কাছে অতি মূল্যবান হয়ে উঠল। তিনি নিজের নাম লিখতে লাগলেন, ‘জিয়াউদ্দিন পাঁচপীরি’(পাঁচপীরি একটা ধর্মীয় সমপ্রদায়)। আব্বু বলেন, এটা এক ধরনের মগজ ধোলাই। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, আব্বু আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী হওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। তবে ছোটবেলা থেকেই আব্বু সব কিছু নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন। এটা ছিল তার অভ্যাস। সরকারি স্কুলে যা পড়ানো হত সে সব নিয়েও শিক্ষকদের কাছে তিনি প্রশ্ন করতেন। যা অন্য কোন ছাত্রই করত না তার ক্লাসে।
