মন্ত্রণালয়ের প্লট বরাদ্দের তালিকায় বিপাকে রাজউক

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০১৩, ২৩:০০
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তিন শতাধিক প্লট বরাদ্দের তালিকা নিয়ে বিপাকে পড়েছে খোদ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। তালিকাটি রাজউকের কোনো বিধি-বিধানের মধ্যে না পড়ায় সংস্থাটির কর্মকর্তারা যেমন বিপাকে পড়েছেন, তেমনি এ নিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন নানা পেশার মানুষ। তারা বরাদ্দকৃত তালিকা নিয়ে প্রতিদিনই রাজউকে ভিড় করছেন। এতে করে সংস্থাটির দৈনন্দিন কাজকর্ম চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় অতিসমপ্রতি রাজউকের বিধি-বিধানের আলোকে বিভিন্ন স্মারকে তিন শতাধিক ব্যক্তির নামে প্লট বরাদ্দের নির্দেশ দেয়। যার মধ্যে রাজউকের একজন বোর্ড সভার সদস্যও রয়েছেন। তালিকায় গণহারে রাজনৈতিক নেতা ছাড়াও রয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা, আমলা, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, ক্রীড়াবিদসহ নানা শ্রেণি ও পেশার মানুষ। রাজউকের বোর্ডসভার সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মকর্তাদের প্লট বরাদ্দের আবেদন গ্রেডিং পদ্ধতিতে এবং অন্য পেশাজীবীদের লটারির মাধ্যমে ২০০৯ সালে প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বর্তমানে কোন সরকারি কর্মকর্তা ও কোন পেশাজীবীকে প্লট বরাদ্দের এখতিয়ার রাজউকের নেই। কেবল সরকার যদি বরাদ্দ বিধিমালার ১৩/এ ধারার প্লট বরাদ্দের বিধান অনুসারে কাউকে সুপারিশ করে তাহলে রাজউক কেবল সুপারিশকৃত ব্যক্তিকে প্লটের প্রাপ্তিতা সাপেক্ষে প্লট বরাদ্দের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। সরকারের শেষ সময়ে এসে প্রতিনিয়ত প্লট বরাদ্দের তালিকা আসছে পূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে। ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত প্লট বরাদ্দ দিতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে রাজউক। রাজউকের বর্তমানে তিনটি আবাসিক এলাকা প্রকল্পের উন্নয়নের কাজ চলছে। এগুলোর মধ্যে প্লট রয়েছে উত্তরা তৃতীয় পর্বে প্রায় ৮ হাজার, পূর্বাচলে ২৪ হাজার এবং ঝিলমিলে প্রায় দেড় হাজার। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলে এসব প্রকল্পের প্রায় অর্ধেক লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ দেয়া হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর কিছু প্লট লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ দেয়া হয়। এরপর লটারি বাদ দিয়ে শুরু হয় দলীয় পছন্দের ব্যক্তিদের প্লট দেয়া। প্রথমদিকে এই কার্যক্রম কিছুটা মন্থরগতিতে চললেও সরকারের শেষ সময়ে এসে তা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এ বছর দলীয় নেতাদের নামে ঢালাওভাবে প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়। ক্ষমতাধরদের পছন্দের এবং দলীয় ও অঙ্গসংগঠনের লোকদের প্লট দিয়ে প্রায় নিঃশেষ করে ফেলা হচ্ছে রাউজকের প্লটের ভাণ্ডার। এর মাধ্যমে বিশাল বাণিজ্যও করে নিচ্ছেন ক্ষমতাধররা। গত বৃহস্পতিবার রাজউক ভবন ঘুরে দেখা গেছে, শত শত মানুষ প্লটের জন্য ছুটাছুটি করছেন। অনেকে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের রুম খোঁজাখুঁজি করছেন। এদের মধ্যে অনেকেই রাজউক ভবনে প্রথমবারের মতো এসেছেন। তিন প্রকল্পের এস্টেট বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে গিয়েই তারা নিজের নাম-পরিচয় দিয়ে প্লটের বরাদ্দপত্র দাবি করছেন। এমন ভিড় সবচেয়ে বেশি পূর্বাচল প্রকল্পের এস্টেট শাখায়। উক্ত শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উত্তরা তৃতীয় পর্ব ও ঝিলমিলে এখন আর প্লট নেই। পূর্বাচলে বরাদ্দযোগ্য প্লট রয়েছে সামান্য। এসব প্লটের জন্য পূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে একের পর এক তালিকা আসছে। এসব তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তাদের মধ্যে ঢাকা জেলার দোহার উপজেলার লোকজন ও আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা লীগসহ অঙ্গসংগঠনের কর্মীরাই বেশি। কর্মকর্তারা জানান, যেভাবে তালিকা আসছে তাতে প্রকল্পগুলোর ধারণ ক্ষমতা ছাড়িয়ে যাবে। এই অতিরিক্ত প্লট কোথা থেকে কিভাবে আসবে সেটা নিয়ে তালিকা প্রণয়নকারী পূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাথাব্যথা নেই। তালিকায় নাম থাকা অনেকে আবার কিছুক্ষণ পর পর সেখানে গিয়ে দ্রুত বরাদ্দপত্র জারির তাগিদ দিচ্ছেন। মন্ত্রণালয় থেকে ফোনও আসছে ঘন ঘন। ঝিলমিল প্রকল্পের এস্টেট শাখায়ও ছিল একই অবস্থা। তবে উত্তরা তৃতীয় পর্বে প্লটের সংখ্যা কম বলে সেখানে প্লটের জন্য দৌড়ঝাঁপ করা লোকজনের উপস্থিতিও ছিল কম। রাজউকের আবাসিক প্রকল্পের প্লট বরাদ্দে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বর্তমান সরকারের আমলে প্লট বরাদ্দ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। এই নীতিমালার ১৩ (এ) ধারা অনুযায়ী প্রতিটি প্রকল্প থেকে কমপক্ষে ১০ শতাংশ প্লট সংরক্ষিত হিসাবে রাজউকের মালিকানায় থাকবে। সংরক্ষিত এসব প্লট রাজউকের ভবিষ্যত্ প্রয়োজনে ব্যবহার করার কথা। রাষ্ট্রের জন্য যারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তাদের এই সংরক্ষিত ভাণ্ডার থেকেই সরকার প্লট বরাদ্দ দিতে পারে। রাজউক প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিগত সরকার পর্যন্ত এভাবে চলে আসছিল। কিন্তু মহাজোট সরকারের শেষ সময়ে এসে পূর্ত মন্ত্রণালয় নীতিমালার তোয়াক্কা করছে না। রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোঃ নূরুল হুদা সংরক্ষিত কোটার প্লট বরাদ্দের কথা স্বীকার করে ইত্তেফাককে বলেন, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে রাজউকে তালিকা আসছে। এই তালিকা দেখেই রাজউক থেকে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্লট বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই বরাদ্দের বেলায় রাজউকের কোনো ক্ষমতা নেই। রাজউক কেবল মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পালন করে মাত্র।