মানুষের জীবনে বয়ঃসন্ধি কাল তথা ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত অত্যন্ত কঠিন একটি সময়। এই সময়টা যেমন একজন মানুষের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে তেমনি নিয়ন্ত্রিত করে জীবনের গতিপথ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ছোটগল্প ছুটিতে এই বয়সের ছেলে-মেয়েদেরকে বালাই বলেছেন। বয়ঃসন্ধির সময়টাতে বাবা-মা এবং পরিবারের মানুষজন যদি একটি ছেলে বা মেয়ের পাশে না দাঁড়ায় তাহলে এই বয়সের ছেলে মেয়ে আসলেই ‘বালাই’-এ পরিণত হয়। তাই এই ব্যাপারে সকলের সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
তমালের বয়স এখন ১৪ বছর। সে নবম শ্রেণিতে পড়ছে। বাবা-মা তার সাথে খুব একটা ফ্রি না। তাই সে নিজের শরীর এবং মনে যে পরিবর্তন আসছে তা তাদের সাথে শেয়ার করতে পারে না। এই বয়সের ছেলে-মেয়েদের জন্য এটা সব থেকে বড় সমস্যা। নিজের ভিতরের কথাগুলো পরিবারের কারোর সাথে শেয়ার করা অত্যন্ত জরুরি। শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা দেয়ার মুহূর্তের এই বয়সে সবার মনটা নিজের ভেতরের তোলপাড়টা কাছের মানুষকে জানাতে চায়। মন খুলে নিজের গোপন কথাগুলো বলতে চায়। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ সেই সুযোগটা পায় না। তবে তমাল সৌভাগ্যবান। কারণ তার ভাই একটি বিশ্ববিদ্যলয়ে পড়ছে। তমাল তার মনের কথাগুলো তার বড় ভাইয়ের কাছে মন খুলে বলতে পারে।
বয়ঃসন্ধি কালের আরেকটি সমস্যা হলো— এই সময় খুব উথাল-পাথালভাবে পার হতে থাকে। আবার আবেগী মনটা কাছের মানুষেদের আচার-ব্যবহারে উনিশ থেকে বিশ হলেই অভিমান করে বা মন খারাপ করে বসে। তবে কাছের কেউ তাকে যদি তার এই বয়সের সমস্যার কথাটা এক ফাঁকে বুঝিয়ে বলে তাহলে এই সমস্যাটা অনেকাংশেই লাঘব হয়ে যায়।
কৈশোরের ১৩ থেকে ১৯ বছর সময়ে যে নিজেকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে দেখা যায় পরে তারা আর সাধারণত বিপথে পা বাড়ায় না। ইতিহাস থেকে দেখা গেছে, মানুষ যত ভাল কিছু বা খারাপ কিছু করেছে তার বীজটি এই সময়টাতেই বপিত হয়েছে। তবে এই বয়সে কেউ খারাপ কিছু করে ফেলতে তাকে দোষ না দিয়ে বুঝিয়ে বলতে হবে। একটা মানুষের জীবনে সবকিছু সে নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। পরিবেশ-পরিস্থিতি-সময় এবং মনের অবস্থার একটা বড় প্রভাব থাকে। তাকে এই বিষয়গুলো বুঝিয়ে বলতে হবে। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়; বয়ঃসন্ধি কালের কিশোর-কিশোরী সবাই একই সমস্যার মধ্য দিয়ে যায়। তবে অধিকাংশ মেয়ে তার মায়ের কাছে নিজের কথাগুলো বলতে পারে বলে মেয়েদের বিপথে যাওয়ার প্রবণতা কম। একই কারণে আমাদের দেশের মেয়েরা বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেদের তুলনায় কম সমস্যার মধ্য দিয়ে যায়। আর এর উল্টোটা ঘটে বলেই ছেলেদের মধ্যে কিশোর অপরাধের প্রবণতা অনেক বেশি। বকাঝকা কিংবা শাসন করে এই বয়সের ছেলে-মেয়েদেরকে বিপথ থেকে দূরে সরানো কঠিন। তাই এর সবথেকে ভাল সমাধান হলো পরিবারের সদস্যদের বিশেষ করে বাবা-মা এবং বড় ভাই-বোনদের কিশোরটির সাথে বন্ধুর মতো মিশতে হবে। একটু সহানুভূতি, একটু ভালবাসা, একটু স্নেহময়ী ব্যবহার, এক টুকরো হাসিমাখা মুখই পারে কিশোরটির জীবনের ভিত গড়ার পথে সব থেকে কঠিন সময়টা সুন্দরভাবে কাটাতে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছুটি গল্পের ফটিক চক্রবর্তী ছিল দুর্ভাগা। ঘরের এক কোণে গুমরে মরলেও নিজের মনের গহীনে লুকানো কষ্ট এবং সুখের কথাগুলো বলার কিশোর মানুষ পায়নি সে। সময় বদলেছে। সাথে সাথে বিস্তার ঘটেছে শিক্ষার। বদলেছে অভিভাবকের ‘হেডমাস্টার’ সুলভ আচরণেরও! তারপরও আমরা এখনো দেখি অহরহ কিশোর অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এর কারণটা আগেই বলা হয়েছে। আমাদের সন্তান, ভাই কিংবা বোনকে আরেকটি ফটিক চক্রবর্তী হওয়া থেকে নিস্তার দিয়ে সুন্দর পৃথিবীটাকে আরো সুন্দরভাবে দেখার জন্য একটু মমতা নিয়ে এগিয়ে আসলেই চলবে। বেশি কিছু না, দরকার শুধু একটু ভালবাসা, একটু সহানুভূতি।
ছবি: সাফাওয়াত খান সাফু। মডেল: মাহবুবুর রহমান, জোহরা মাহবুব ও আদ্রিতা
