শিশুদের পরীক্ষা নিয়ে উদ্বেগ

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০১৩, ১৯:৪৪
হ্যালো, মিসেস শিখা, কাল নাকি আবার হরতাল? পরীক্ষা কি আবার স্থগিত? মোবাইলের অপর প্রান্ত থেকেও ভেসে আসছিল উদ্বেগের স্বর। টানা হরতালের পর রাস্তায় এক শংকার পরিবেশ। সকলেই ভবিষ্যত্ নিয়ে অনিশ্চিত। এর মাঝে গত বৃহস্পতিবার দেখলাম বেশ কিছু অভিভাবক চিন্তিত মুখে মতিঝিল সরকারি বালক বিদ্যালয়ের সামনে বসে রয়েছেন। অভিভাবক হিসেবে তাদেরই পরীক্ষা যেন চলছে, সে উপলব্ধিই হল। সকলের মুখেই এক করুণ আকুতি। ফুটপাতে বসে থাকা আফরোজা বেগমের সাথে তার মনের অনুভূতি জানতে কথা হচ্ছিল। আফরোজা বেগম বলেন, তার মেয়ে এবার জেএসসি পরিক্ষার্থী। গত বৃহস্পতিবার ছিল তার প্রথম পরীক্ষা। তিনি বলেন, হরতালের অনিশ্চয়তার জন্য এবারে ওর পরীক্ষা কেমন হয় তা নিয়ে আমি সন্দিহান। এছাড়া পরীক্ষা শেষ করার লক্ষ্যে সব পরীক্ষা পর পর নিয়ে নেয়া হচ্ছে শুক্র, শনিবারগুলোতে, যা শিশুদের অনেক সময় চাপে ফেলে। তাই আমি আমার মেয়ের ভবিষ্যত্ নিয়ে সন্দিহান। এভাবেই অভিভাবকদের গলায় কাকুতি মিনতির সুর ফুটে উঠে আসছিল। এবার জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে প্রায় ১৫ লাখ ৮৭ হাজার ৩১৩ জন, যাদের সবারই মানসিক অবস্থা একই। বর্তমান নয়, গত প্রায় তিন দশক ধরে আমরা দেখছি রাজনৈতিক নৈরাজ্যের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয় এই শিক্ষার্থীরা। জেএসসি এবং পিএসসির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা শেষ হতে বড়জোর দুই সপ্তাহের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এই অনিশ্চিত পরিস্থিতি তাদের পড়ার আগ্রহ বহুগুণে কমিয়ে দিয়েছে। যা আশা অনুযায়ী অনেক খারাপ ফলাফলের কারণ হয়েও দাঁড়াতে পারে এবং শিশুদের তার এই খারাপ ফলাফলের বোঝা বহন করে বেড়াতে হবে সারা জীবন। বর্তমানে এর গুরুত্ব হয়ত অনেকে অনুভবই করছে না। পরে নিজেদের পরীক্ষার সময়কার রাজনৈতিক নৈরাজ্যকেই দায়ী করবে তাদের দুর্ভাগ্যের জন্য, যে সত্য বাধ্য হয়ে হলেও সারাজীবন মেনে চলতে হবে তাদের। পরীক্ষার্থী শ্রেয়া আক্তার ও তার পরিবারের অভিজ্ঞতা শ্রেয়া এ বছর জেএসসির পরীক্ষার্থী। সে আজিমপুর গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্রী। শ্রেয়া বলে, আমরা দুই ভাই-বোন। আমার ভাই আমার চেয়ে ছোট। আমার ভাই এবার পিএসসি পরীক্ষা দেবে এবং আমি জেএসসি। শ্রেয়া বলছিল, সব পরিক্ষার্থীরই পরীক্ষার সময়সূচি অনুযায়ী একটি পরিকল্পনা থাকে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আমি কীভাবে পড়ব কিছুই বুঝতে পারছি না। একটা পরীক্ষার পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে যখন জানি যে এরপর তিন দিন হরতাল, তখন মনটা ভেঙ্গে যায়। তাও অপেক্ষা যদি পরীক্ষা হয়। রাত দশটার পর বুঝি পরীক্ষা হবে কি হবে না। পুরো প্রস্তুতি নিয়ে আবার অন্য পরীক্ষার জন্য তৈরি হওয়া। এরপর যখন এ বিষয়ে প্রকৃত পরীক্ষা হবে, তখন কি আর পড়তে ইচ্ছা করবে । তখন মনে হয়, পরীক্ষা হলে হবে না হলে নেই, পড়ার দরকার নেই। এ ধরনের মনোভাব থেকে আমার পরীক্ষা অনেক খারাপ হবে, যে প্রস্তুতি ছিল তার চেয়ে। সবই আমি বুঝতে পারছি, কিন্তু এ অবস্থায় আমাদের কি কিছুই করার নেই যেন পরীক্ষাটুকু আমরা শান্তিতে দিতে পারি। শ্রেয়ার মা কুমকুম বলছিলেন এই দুই ছেলে-মেয়ের পরীক্ষা নিয়ে আমার অবস্থা খুবই কাহিল। কখন কী হয় কিছুই বলা যায় না। কখনও হরতালের আগের দিন থেকে গন্ডগোল শুরু হয়। তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়েও অস্থির থাকি। সব পরীক্ষা পর পর দেয়াও ওদের জন্য বেশ কঠিন। নৈরাজ্যের যে চেনাজানা চিত্র আমাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে, তার কি পরিবর্তন আনা কোনকালেই সম্ভব না? পরীক্ষার্থী পলা আহমেদ ও তার পরিবারের মতামত পলা আহমেদ এবার জেএসসি পরীক্ষার্থী। সে বলে আমরা প্রথম ব্যাচগুলোর একটি। নতুন বই, নতুন সিলেবাস, এসবই আমাদের জন্য ছিল নতুনত্বে ভরা। অনেক নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে এবারের বিজ্ঞান, অংকে। এর ওপর সৃজনশীল পরীক্ষা। পরীক্ষার ধরন, প্রশ্ন, এসব নিয়ে তাই প্রথম থেকে খুব উদ্বেগ ছিল। সে অবস্থা বিবেচনা করে বিষয় অনুযায়ী খুব সুন্দরভাবে আমাদের পরীক্ষার রুটিন করা হয়েছিল। কিন্ত এখন এই হরতালের জন্য সব পরীক্ষা এসে পড়েছে একদম পরপর। এই বিশাল সিলেবাস একরাতের মধ্যে রিভাইজ করা খুবই কঠিন। এরপর যখন পুরো প্রস্তুতি নিয়ে দেখি পরীক্ষা হয় না— এ অবস্থা চলতে থাকলে সত্যি পরীক্ষার আগের রাতে আর পড়ার ধৈর্য থাকে না। এই পরীক্ষার ফলাফলের ওপর আমাদের ভবিষ্যত্ নির্ভর করে, কিন্তু যখন পরীক্ষার শেষ কবে তার উত্তর খুঁজে পাই না, তখন আর পড়তেই ইচ্ছা করে না। কি দোষ করেছিলাম আমরা জানি না যে আমাদেরই এই পরিস্থিতিতে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। পরে যখন ফলাফল নিয়ে বিবেচনা করা হবে তখন তো আর কেউ মনে রাখবে না যে, খারাপ ফলাফলের পেছনে কারণ হিসেবে ছিল এখনকার পরিস্থিতি। হরতালের পরিপ্রেক্ষিতে পরীক্ষা কবে হবে সে সিদ্ধান্ত যদি অনেক আগে থেকে জানানো হত, তা আমাদের জন্য অনেক ভালো হত। পলা আহমেদের মা বলেন, আজকে ওর ফলাফল যাই হোক না কেন আমি মেনে নেব, কেননা এরকম মানসিক চাপের মধ্যে পরীক্ষা ভাল দেয়া কঠিন এবং এর ফল বহন করতে হবে এ বছর সব পরীক্ষার্থীদেরই। দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দেখতে পাই কিছু সময় পরপর দেশে এক অস্থির অবস্থার সৃষ্টি হয়। যাতে সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের শিক্ষার্থীরা। যারা দেশের ভবিষ্যত্। এই তরুণ, কিশোর সমাজকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার জন্য সব পরীক্ষাকে হরতাল-অবরোধের আওতামুক্ত রাখতে স্থায়ী সমাধান একান্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।