দুদককে অধিক ক্ষমতা দিয়ে আইন সংসদে পাস

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০১৩, ২২:২৮
মামলা হবে আপস ও জামিন অযোগ্য আদালতের অনুমতি ছাড়াই সম্পদ জব্দের ক্ষমতা বর্তমান সরকারের মেয়াদের শেষ মুহূর্তে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) প্রচলিত অন্যান্য আইনের উপর এই সংশোধনীর ফলে দুদকের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেল। প্রাধান্য দিয়ে আলোচিত দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) বিল-২০১৩ পাস হয়েছে। তবে সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমতির বিধান যুক্ত করায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন দুদক কমিশনার সাহাবুদ্দিন চপপু। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, এ ধরনের বিধান যুক্ত করা হলে তা সরকারি কর্মচারীদের জন্য পৃথক বিধান হবে; যা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি আদালত মানবে না। সংবিধানের সকল নাগরিকের সমঅধিকারের বিধানের পরিপন্থী এটি। এতে দুদকের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে। গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হলে এ বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। সংশোধিত আইনে দুদক কমিশনারদের মেয়াদ চার বছরের জায়গায় পাঁচ বছর করা হয়েছে। এছাড়া দুর্নীতির অভিপ্রায় ব্যক্ত করাও দুর্নীতির অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। ষড়যন্ত্র, সহায়তা করারও অপরাধও আমলে নিতে পারবে দুদক। দুদক ছাড়া বা দুদকের অনুমতি ছাড়া কোন আদালত দুর্নীতির মামলা বিচারের জন্য গ্রহণ করতে পারবে না। সে সাথে দুদক আইনের অধীনে অপরাধসমূহ আমলযোগ্য, অ-আপসযোগ্য এবং অ-জামিনযোগ্য করা হয়েছে। বিশ্বাস ভঙ্গ, প্রতারণাসহ দণ্ডবিধির বেশকিছু অপরাধ দুর্নীতি দমন কমিশনের অধীনে আমলে নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে সংশোধিত আইনে। সংসদ সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব ভীম চরণ রায় ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সময় সরকারের পূর্বানুমতি নেয়ার সনদ মামলার নথির সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে বলেও সংশোধনী প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। গতকাল রাতে ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলীর সভাপতিত্বে অধিবেশনে বিলটি পাসের প্রস্তাব করেন সংসদ কার্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী। সংশোধিত বিলে বলা হয়েছে, দেশ-বিদেশে সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজদের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সম্পত্তির বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ সহজতর হবে। দুদক আইনকে প্রাধান্য দিতে মূল আইনের ‘২ক’ উপ-ধারা সংযোজন করে বলা হয়, ‘আপাতত বলবত্ অন্য কোনো আইনে যা কিছু থাক না কেন, এ আইনের বিধানাবলী প্রাধান্য পাবে’। বিরোধী দলের ১৮ জন এবং একমাত্র স্বতন্ত্র সদস্য বিলের উপর জনমত যাচাই ও সংশোধনীর দুটি পৃথক প্রস্তাব দেন। কিন্তু তাদের কেউ-ই সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত না থাকায় সেসব প্রস্তাব উত্থাপিত হয়নি। তবে মহাজোটের তিনজন সদস্য ১১টি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এরা হলেন আওয়ামী লীগের নূরুল ইসলাম সুজন, রআম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এবং জাতীয় পার্টির (এ) মো. মুজিবুল হক। মো. মুজিবুল হক সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করে বলেন, দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বিদায়ের সময় বলেছিলেন, দুদক হচ্ছে নখ ও দন্তহীন বাঘ। আমার মনে হচ্ছে এ কথার জন্যই সরকার দুদককে শক্তিশালী করার জন্য বিলটি এনেছে। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য দুদককে আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তিনি এরশাদের কথা উল্লেখ করে বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদের মামলা ১৮ বছরেও দুদক শেষ করতে পারেনি। তাকে এ ১৮ বছর ধরে আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সাধারণ লোকদের অবস্থা কী হবে তা সহজেই অনুমেয়। কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, দুর্নীতি আমাদের একটি সামাজিক ব্যাধি। আমরা চাই দেশ এগিয়ে যাক। দুর্নীতির মধ্যে না পড়ে যাতে দেশ এগিয়ে যায় তা আমরা চাই। আর সে লক্ষ্যে এ বিলটি আনা হয়েছে। তিনি সম্মতি প্রদান করায় উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, নূরুল ইসলাম সুজন এবং মো. মুজিবুল হকের সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের সদস্য শাহবুদ্দিন চপপু ইত্তেফাককে বলেন, সংশোধিত আইনে গুরুত্বপূর্ণ কতিপয় ধারা সংযোজন করা হয়েছে। ২৩ (ক) ধারা সরকারি, স্বশাসিত এমনকি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে তথ্য প্রদানে এক প্রকার বাধ্যবাধকতার মধ্যে আনা হয়েছে। দুদকের মূল আইনের ২৩-ক উপ-ধারা যোগ করে বলা হয়েছে, অন্যকোন আইনে যা-ই থাকুক না কেন, দুর্নীতি প্রতিরোধের বিষয়ে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক, র্যাব, পুলিশসহ সরকার কর্তৃক ঘোষিত প্রতিষ্ঠান কমিশনকে তথ্য প্রদান করবে। বিলে দুদক মামলায় কোন ব্যক্তি জামিন চাইলে আদালত কমিশনকে যুক্তিসঙ্গত সময় না দিয়ে শুনানি গ্রহণ করা যাবে না মর্মে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। দুদক আইনের ৩৩-এর উপ-ধারা-৫ সংযোজন করে বলা হয়েছে, দুদক গৃহীত যে কোন কার্যক্রমের যে কোন পর্যায়ে কোন আদালতে কেউ কোন প্রতিকার চাইলে মামলায় দুদককে পক্ষভুক্ত করতে হবে। আইনে তথ্য প্রদানকারীর পরিচয় গোপন রাখার কথা কলা হয়েছে। তবে কেউ যদি দুদকে মিথ্যা তথ্য প্রদান করে তাহলে সে অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। বিলে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না করলে বা স্বউদ্যোগে তথ্য প্রদানে ব্যর্থ হলে আইনে সংশ্লি¬ষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে। দুদক আইনে কোন ব্যক্তির দেয়া তথ্য দেওয়ানি বা ফৌজদারি আদালতে সাক্ষ্য হিসাবে গ্রহণ কার যাবে না বা কোন সাক্ষীকে অভিযোগকারীর পরিচয় প্রকাশ করতে বাধ্য করা যাবে না। তবে অপরাধের পূর্ণ তদন্তের পর আদালত যদি মনে করে, মিথ্যা তথ্য প্রদান করা হয়েছে বা তথ্য প্রদানকারীর পরিচয় প্রকাশ করা ছাড়া ন্যায় বিচার করা সম্ভব নয়, তাহলে আদালত পরিচয় প্রকাশ করতে পারবে। কেউ মিথ্যা তথ্য প্রদান করলে আইনের ২৮ গ ধারার (২)-এর ১ উপ-ধারায় অপরাধী হিসাবে গণ্য হবেন এবং কমপক্ষে দুই বছর এবং সর্বোচ্চ পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। বিলে বলা হয়, দুদক আইনে মামলা দায়েরের সময় কমিশনের এবং ক্ষেত্র বিশেষে কমিশন ও সরকারের যৌথ অনুমোদনপত্রের কপি আদালতে দাখিল করতে হবে। এছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধি বা আপাতত বলবত্ অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, নির্ধারিত পদ্ধতিতে কমিশনের অনুমোদন ছাড়া কোনো আদালত দুদক আইনের অধীনে অপরাধ আমলে নিতে পারবে না। দুদক আইনের অধীনে অপরাধসমূহ আমলযোগ্য, অ-আপসযোগ্য এবং অ-জামিনযোগ্যের প্রস্তাব করা হয়েছে।