‘আই অ্যাম মালালা’

আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০১৩, ২২:৩৩
পারিবারিক বিরোধ এমন তুঙ্গে ছিল যে, জ্ঞাতি ভাইদের কাছে আমার আব্বুকেও কম নাজেহাল হতে হয়নি। আব্বুর জ্ঞাতি ভাইয়েরা জানতেন, যেহেতু আমার আব্বু কালো এবং খানিকটা বেটে, সে কারণে স্কুল শিক্ষকরা তাকে পছন্দ করেন না। কারণ, সবাই সুন্দর চেহারা ভালোবাসেন। তাই তারা স্কুল থেকে ফেরার পথে তাকে ‘কালো’ ‘বেটে’ এসব বলে খেপাতেন। আমাদের সমাজে এভাবে কেউ উত্ত্যক্ত করলে তার উপযুক্ত প্রতিশোধ নেয়াই নিয়ম; কিন্তু আব্বু তার জ্ঞাতি ভাইদের চেয়ে অনেক ছোট ছিলেন, তিনি তাদের কিছু বলতে পারতেন না। আব্বুর ধারণা, তিনি তার বাবা অর্থাত্ আমার দাদাকে সন্তুষ্ট করার মতো তেমন কিছুই করতে পারেননি। দাদার হাতের লেখা ছিল মুক্তার মতো সুন্দর। আব্বু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে হাতের লেখা অভ্যাস করতেন; কিন্তু দাদা কখনোই সে লেখার প্রশংসা করেননি। তবে আমার দাদি আব্বুকে খুব ভালোবাসতেন। সবকিছুতে অনুপ্রেরণা দিতেন এবং মনে করতেন, তার এই ছেলের ভেতর অনেক সত্ গুণ রয়েছে। দাদি নিজে না খেয়ে আমার আব্বুর জন্য মাংস ও দুধের সর লুকিয়ে রেখে দিতেন। আমাদের সেই গ্রামে ইলেক্ট্রিসিটি ছিল না, লেখা-পড়া করাও খুব সহজ ব্যাপার ছিল না। বৈঠকখানায় গিয়ে কেরোসিনের কুপির আলোতে বসে লেখা-পড়া করতে হতো। একদিন সন্ধ্যা বেলা পড়তে পড়তে আব্বু ঘুমিয়ে পড়েন। একসময় কুপিটা পড়ে যায়। ভাগ্য ভালো যে, আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই দাদি দেখে ফেলেন। আব্বুর ওপর দাদির বিশ্বাস ও আস্থার কারণে আব্বুর মনে একটা আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে এবং যা তাকে সারা জীবন পথ দেখিয়েছে। তবে দাদি একবার খুব রেগে গিয়েছিলেন আমার আব্বুর ওপর। আমাদের গ্রাম থেকে বেশ দূরে ডেরাই সাইদান নামে একটা ধর্মীয় স্থান ছিল। সেখান থেকে ফকিররা আসতেন ভিক্ষা করতে। একদিন তারা যখন আমাদের বাড়ি এসেছেন তখন দাদা বা দাদি বাড়িতে ছিলেন না। সে সময় আব্বু কাঠের বাক্সের তালা ভেঙ্গে তাদের গামলা ভরে ভুট্টা দিয়েছিলেন। এরপর আমার দাদা-দাদি বাড়ি ফিরে আব্বুকে আচ্ছা করে পিটিয়েছিলেন। পশতুনরা ঐতিহ্যগতভাবে মিতব্যয়ী (যদিও অতিথি পরায়ণতায় খ্যাতি আছে) এর মধ্যে আমার দাদা ছিলেন আরো হিসাবি। তার সন্তানদের কারো থালা থেকে খাবার পড়ে গেলে তিনি ভয়ানক রেগে যেতেন। তিনি নিজে অত্যন্ত নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলতেন। তার সন্তানরা সবাই কেন যে এক রকমের হয়নি—এটা তিনি বুঝতে পারতেন না। নিজে শিক্ষক ছিলেন বলে স্কুলে তার ছেলেরা বেতন, খেলা-ধুলা বা বয়স্কাউটে যোগদান—সব কিছুতে কনসেশন বা ছাড় পেতেন; কিন্তু এই কনসেশনের পরিমাণটা এতই কম যে, অধিকাংশ শিক্ষকই সেটাকে তেমন কোন গুরুত্ব দিতেন না। তবে দাদা সেই কনসেশনের জন্য আবেদন করতে তার ছেলেদের বাধ্য করতেন। যদিও এই আবেদন করতে আমার আব্বুর ভালো লাগত না। তিনি যখন আবেদনপত্র নিয়ে প্রধান শিক্ষকের অফিসের সামনে যেতেন, তখন ঘামতে ঘামতে পুরোপুরি ভিজে যেতেন। তিনি যখন অফিসে ঢুকতেন তখন তার অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যেত। আব্বু আমাকে বলেছেন, ‘তখন মনে হতো, মাত্র ৫টি টাকার জন্য আমার মান-সম্মান সব ধূলিসাত্ হয়ে গেল!’ আমার দাদা কখনো আব্বুকে নতুন বই কিনে দিতেন না। তিনি তার ছাত্রদের বলে দিতেন তারা যেন তাদের পুরানো বইগুলো আব্বুর জন্য রেখে দেয়। বছর শেষে দাদা আব্বুকে পাঠিয়ে দিতেন সেইসব ছাত্রের বাসায়—বই জোগাড় করতে। আব্বুর লজ্জা করতো তবে তার কোন উপায় ছিল না। পুরানো বই জোগাড় না করলে তার লেখা-পড়াই বন্ধ করে দিতে হতো। তার ক্লাসের বইতে অন্য ছাত্রদেরই নাম লেখা থাকত, আব্বুর নাম নয়। আব্বু বলেন, ‘পুরানো বই পড়া যে খুব খারাপ তা নয়। তবে, নতুন বই পেতে খুব ইচ্ছা করতো আমার। অন্য কারো নাম না লেখা, কোন রকম দাগা-দাগি না করা একেবারে ঝকঝকে নতুন বই—বাবার টাকায় কেনা।’