সংবিধান লংঘন করে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) বিল ২০১৩ পাস করা হয়েছে। এর ফলে আইনের প্রয়োগ রাজনীতিবিদদের জন্য একরকম এবং সরকারি কর্মচারীদের জন্য অন্যরকম হবে। সংবিধানে বৈষম্যমূলক আইন প্রণয়নের উপরে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই এই আইন পাস করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি এবং দাতা দেশ ও সংস্থাসূমহের আপত্তি অগ্রাহ্য করে পাস করা হলো বিলটি। এর ফলে সরকারের অনুমোদন ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা আমলে নিতে পারবে না দেশের কোন আদালত।
সংবিধানের তৃতীয় ভাগের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ একইভাগের ২৬(২) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, ‘রাষ্ট্র এই ভাগের কোন বিধানের সহিত অসামঞ্জস্য কোন আইন প্রণয়ন করিবেন না এবং অনুরূপ কোন আইন প্রণীত হলে তাহা এই ভাগের কোন বিধানের সহিত যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।’ সংবিধানের এইরূপ স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সমতার নীতি লংঘন করে দুদক বিল পাস করা হয়েছে। এর ফলে নাগরিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে তফাত্ সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ল’র পরিচালক ড. শাহদীন মালিক ইত্তেফাককে বলেন, দুদক যাতে স্বাধীনভাবে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনতে না পারে সেইজন্য এটি করা হয়েছে। এই আইন সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতিতে উত্সাহিত করবে। দুদক চেয়ারম্যান এম বদিউজ্জামানও এই আইনকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের এবং সংসদীয় কমিটির আপত্তি অগ্রাহ্য করে এই আইন পাস করা হয়েছে।
গত রবিবার জাতীয় সংসদে দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধন বিল ২০১৩ পাস করা হয়। এর ফলে কমিশন সরকারের অনুমোদন ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করতে পারবে না। সংসদ কাজে মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বিলটি উত্থাপন করলে সাতটি সংশোধনীসহ তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। সরকারি দলের সংসদ সদস্য ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আ ম উবাদুল মোকতাদির চৌধুরীর দেয়া সংশোধনী প্রস্তাবের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের ছাড় দেয়ার বিধানটি অন্তর্ভুক্ত হয়। আড়াই বছর পর পাস হওয়া এই বিলে নতুন করে ৩২/ক ধারা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জজ, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারা আবশ্যিকভাবে পালন করতে হবে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারায় বলা আছে জজ, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মকর্তা কোনো অভিযোগে অভিযুক্ত হলে সরকারের অনুমোদন ছাড়া কোনো আদালত সেই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমলে নিতে পারবেন না। কোন আদালতে এই মামলার বিচার হবে, তা সরকার নির্ধারণ করে দেবে।
এ-সংক্রান্ত আগের আইনে (৩২ ধারা) সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের একক ক্ষমতা ছিল। এই ধারাটি সংশোধন করে বলা হয়েছে, কমিশনের অনুমোদন ছাড়া কোনো আদালত এই আইনের অধীন কোনো মামলা আমলে নিতে পারবে না। শুরু থেকেই সংসদীয় কমিটি এ বিধান না রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়। এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য সংসদীয় কমিটি অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া সফর করে দেশগুলোর এ-সংক্রান্ত আইন পর্যালোচনা করে। এ ছাড়া কমিটি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মতবিনিময় করে। দাতা সংস্থাসূমহ থেকে আপত্তি জানানোর পর খোদ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও চিঠি দিয়ে দুদকের ক্ষমতা খর্ব না করার জন্য কমিটিকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সবশেষে গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর কমিশন এ বিষয়ে সংসদে প্রতিবেদন জমা দেয়। তাতে তারা সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা-সংক্রান্ত কমিশনের ক্ষমতা বহাল রাখার পক্ষে মত দেয়। এরপর গত ২৮ অক্টোবর বিলটি পাসের জন্য সংসদের উত্থাপন করা হয়। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে সেদিন বিল পাস না করে প্রত্যাহার করা হয়। অবশেষে রবিবার সংশোধনীর মাধ্যমে কমিশনের ক্ষমতা খর্ব করে বিলটি পাস হয়।
ড. শাহদীন মালিক বলেন, দুদকের সংশোধনী এই বিলটি ২০১১ সালে উপস্থাপন করা হয়েছিল। সেই সময় আমরা ও উন্নয়ন সহযোগীরা এই বিলের বিরোধিতা করি। কারণ এই বিলে যে সংশোধনী আনা হয়েছিল তাতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা করা কঠিন হবে। দুদকের ক্ষমতা ব্যাপকভাবে খর্ব হত। এছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অন্য কোন নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলার ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি হত। এই তিনটি কারণে আমরা এই বিল প্রতিহত করার চেষ্টা করি। তিনি বলেন, তখন আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এই বিলের বিপক্ষে মত দেয়ায় তা পাস হয়নি।
শাহদীন মালিক বলেন, সরকারের শেষ মুহূর্তে এসে তড়িঘড়ি করে এই বিল পাস করার একটি অন্যতম কারণ হতে পারে যে, এই সরকারের আমলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্নীতিতে লিপ্ত ছিলেন এবং এটি তাদের রক্ষা করার একটি প্রয়াস বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সরকারকে চরম অজনপ্রিয়তার থেকে রক্ষা করার জন্য এই বিলে সম্মতি দেয়া থেকে রাষ্ট্রপতিকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করছি। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে আদালত অবমাননা আইন করায় তা অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। এই রায়ের বিষয়টি জ্ঞাত থাকার পরেও এই ধরনের আইন পাস করা আদালতের ব্যাখ্যাকে অবজ্ঞা করার শামিল।
দুদক চেয়ারম্যান এম বদিউজ্জামান বলেন, সংবিধানে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা আছে। এখানে সে অধিকার খর্ব করা হয়েছে। এ ছাড়া সংসদীয় কমিটির মত অনুসারে এই বিল পাস হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
