আমার জন্ম ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে। শৈশব-কৈশোর কেটেছে আসামের মরিয়ানী শহরে। আব্বা সেখানে ব্যবসা করতেন। ১৯৫৮ সালে আব্বা শেখ শমসের আলীর সাথে আমরা জন্মভূমি রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির শালমারায় চলে আসি। ১৯৬৬ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে চাকরির সন্ধানে আসি ঢাকায়। ঢাকায় আসার আগেই দেশের পত্র-পত্রিকায় আমার লেখা ছাপা শুরু হয়।
কৈশোরেই বুঝতে পারলাম, পদ্য লেখা ও আঁকার শখ আছে আমার— আশপাশে যা অন্য কারো নেই। ভেতরের তাগিদেই প্রমিত উচ্চারণে পদ্য পাঠের একটা ঝোঁক বরাবরই ছিল। পরিণতিতে আবৃত্তিকার হলাম, বেতারে খবর পাঠের সুযোগ পেলাম। কই, আমার পাশের কাউকেই তো দেখিনে তেমনটা। আমি তো বলি: এগুলোই হলো আল্লাহ-প্রদত্ত গুণ বা প্রতিভা— চরিত্রেই সুপ্ত থাকে, ক্রমশ পরস্ফুিট হয়। প্রায় ২০ বছর বাংলাদেশ বেতারে খবর পাঠ করেছি। কবি হিসেবে আত্মতৃপ্তি অমূলক তবু কারো কারো বিবেচনায় তো পুরস্কৃতও হলাম। কবি-জীবনের শেষ নেই, চর্চা করলে চলতেই থাকবে। আমার মৃত্যুর পরও যদি ভবিষ্যতে কেউ আমার কবিতা পাঠ করে, তবেই সার্থক বলা যাবে। আমার আরেক গুণ ছবি অংকন। জয়নুল আবেদীন, কাইয়ুম চৌধুরী, হাশেম খান, রফিকুন্নবীদের মতো বড় শিল্পী হবার স্বপ্ন ছিল; হতে পারলাম না। কিন্তু অন্যদিকে তো আমি বিশাল জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রতিদিনই কার্টুন এঁকে চলেছি— যা অবশ্যই গর্ব করবার মতো। আমার কার্টুন এদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেও একক অবদান রেখেছে। ছবি এঁকে ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর সাথে জেল খেটেছি বাংলাদেশে একমাত্র আমিই।
‘অনুশীলন সংঘ’ আরেক স্বপ্নের ফসল। স্বাধীনতার পর এদেশে কোনো জোরালো সাহিত্য সংগঠন ছিল না— যারা নিয়মিত গঠনমূলক সাহিত্য সভা করে। ১৯৭৪ সালের ৯ জুন ইসলামিক ফাউন্ডেশনে আমার অফিসকক্ষে সংঘের নামে সাহিত্যসভা শুরু করলাম। আমি প্রথমে বন্ধুস্থানীয় এবং পরে অনুজ সাহিত্যকর্মীদের নিয়ে সংঘের নিয়মিত সাপ্তাহিক সাহিত্যসভা চালিয়ে এলাম প্রায় ১০ বছর ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত। নানা কারণে ১৯৮৪’র পর আর তা চালানো সম্ভব হয়নি। গর্বের কথা; সাংবাদিকতা-গণমাধ্যম সংগীত ক্ষেত্রের কীর্তিমান গুণীজন হিসেবে সম্মানিত। দেশ-জাতির জন্য অনুশীলন সংঘের এই বিরাট ভূমিকা আমার জন্যও অহংকারের জায়গা। অসংখ্য অনুজ ও গুণবানদের কাছে ‘তোফাজ্জল ভাই’ এবং ‘অনুশীলন সংঘ’— এখনও আলোচ্য বিষয়। আনন্দের সঙ্গে স্মরণ করছি— অনেকে আমাকে তাঁদের বই উত্সর্গ করেছেন। তাদের মধ্যে বন্ধু আলী ইমাম, সৈয়দ আল ফারুক, খালেক বিন জয়েনউদদীন, লুত্ফর রহমান রিটন, আমীরুল ইসলাম, আহমদ মাযহার, আহমদ কফিল, আন্দালিব রাশদী, আহমদ কায়সারের নাম উল্লেখযোগ্য। এরা প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে কীর্তিমান।
চাকরি জীবনের কথাও বলি। ইসলামিক একাডেমিতে ঢুকেছিলাম কারণিক হিসেবে, অবসর নিলাম উপ-পরিচালক হিসেবে। শিশুদের মাসিক ‘সবুজ পাতা’র ১৪ বছর এবং মাসিক ‘অগ্রপথিক’-এর ৬ বছর সম্পাদক ছিলাম। অনেক লেখক আমার প্রণোদনায় তৈরি হয়েছে। চিত্রশিল্পী হিসেবে প্রায় ৪০০ বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছি, অনেক বইয়ের অলংকরণ করেছি। এখনও করি। তবে আমার একটা ইচ্ছা এখনও পুষছি। আমি কিছু জলরঙ ও তেলরঙের বড় ছবি আঁকতে চাই।
আমার বাছাইকৃত প্রায় ৩০০ কবিতা এবং ১০০ ছড়া প্রকাশের অপেক্ষায় আছে। প্রকাশকরা আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে এলে আমি আনন্দিত হবো। আমার একটি প্রিয় ছড়ার বইয়ের নাম ‘পরমপ্রিয়’। প্রায় হাজার খানেক বিশিষ্ট কার্টুন আছে, সেগুলোও প্রকাশ পাওয়া দরকার। আমার একটি বড় চাওয়া: আমার কার্টুনের প্রদর্শনী হোক। তাতে দর্শক এবং আগ্রহী শিল্পীরা কার্টুন আঁকায় এগিয়ে আসবে। আমাদের দেশে প্রতিভাবান শিল্পীর অভাব নেই, কিন্তু সম-সময়ের সমালোচক কার্টুন-শিল্পীর বড়ই আকাল। একটা কার্টুন স্কুল হলে মন্দ হতো না। মাঝে-মধ্যে কর্মশালাও হতে পারে। আমি বহু বছর দৈনিক ইত্তেফাকে কার্টুন এঁকেছি।
আমার বয়স তেষট্টি, অসুস্থতার ফলে প্রায় অচল। পেনশনহীন চাকরির গ্রাচুইটির টাকায় ছোট ৪ কক্ষের পাকা বাড়ি করে বাস করছি। নিচুতলায় ভাইবোনের বাড়ি, ওপরে অর্থাত্ ৩ তলায় স্নেহাস্পদ মামা-মামীদের। ঢাকার পাশেই আমিনবাজারে আমার এই বাড়ির স্বপ্নও কোনোদিন ছিল না। আমি মহান আল্লাহর ইচ্ছা-দানে এতদূর এসেছি। তিনিই ভাল জানেন— আর কতদিন বাঁচব ও কর্মঠ থাকব। একটাই প্রত্যাশা অন্যকে কষ্ট না দিয়ে যেন মারা যাই। ততদিন কর্মক্ষমও থাকতে চাই।
বর্তমান সমাজ-সংসারে আমাদের মতো সত্ জীবনযাপন করা খুব কঠিন। সততার তৃপ্তি থাকলেও বাস্তবে তা খুব কষ্ট দেয়। অল্পে তুষ্ট আর সৃজনকর্ম লালন করা আরো কষ্ট। নতুন প্রজন্মকে ত্যাগ আর কর্মের ভেতর দিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। অর্জনের পেছনে ত্যাগের ভূমিকা এবং অল্পে তুষ্টির কোনো বিকল্প নেই।
