‘আই অ্যাম মালালা’

আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০১৩, ২২:২২
দাদার এই কিপ্টেমি আব্বুকে মনে-প্রাণে উদার হতে সাহায্য করে। তিনি যে কোন মূল্যে জ্ঞাতি ভাইদের সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে ফেলারও সিদ্ধান্ত নেন। আব্বুর স্কুলের প্রধান শিক্ষকের স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে আব্বু তাকে রক্ত দেন। এতে সেই শিক্ষক ভদ্রলোক এত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং আব্বুকে বিভিন্ন কারণে ভর্ত্সনা করায় দুঃখ প্রকাশ করেন। আব্বু যখন তার শৈশবের গল্প বলতেন, তখন একটা কথা বার বার বলতেন। তিনি বলতেন, আমার দাদা কঠোর প্রকৃতির মানুষ হলেও আব্বুকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপহারটা তিনিই দিয়েছেন। সেটি হল শিক্ষা। ইংরেজি ও আধুনিক শিক্ষা লাভের জন্য আব্বুকে তিনি মাদ্রাসায় না পাঠিয়ে পাঠিয়েছিলেন সরকারি হাই স্কুলে। একজন ইমাম তার ছেলেকে মাদ্রাসায় না পাঠিয়ে ইংরেজি শিখতে পাঠানোতে সবাই দাদার সমালোচনা করত। আব্বুকে গভীর ভালোবাসতেন বলেই দাদা তাকে জ্ঞানার্জন ও মানুষের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে চেয়েছিলেন। এর ফলে আব্বুর ভেতর যে চেতনা গড়ে ওঠে, সেটাই তিনি সঞ্চারিত করেন আমার ভেতর। জুমার নামাজের আগে খুত্বা পাঠের সময় দাদা দেশের দরিদ্র এবং বুর্জোয়া ভূস্বামীদের প্রসঙ্গ তুলে বলতেন, ইসলাম বুর্জোয়াতন্ত্রের বিরুদ্ধে। তিনি আরবি ও ফারসি জানতেন এবং শব্দচয়নে অত্যন্ত সচেতন থাকতেন। তিনি শেখ সাদি, রুমি, আল্লামা ইকবালসহ বড় বড় কবিদের কবিতা আব্বুকে এমন আবেগের সঙ্গে পড়ে শোনাতেন মনে হত তিনি যেন মসজিদের সমস্ত লোককে শোনাচ্ছেন। দাদার একান্ত ইচ্ছা ছিল, আমার আব্বু ডাক্তার হোক। কিন্তু আব্বু কবিতা লিখতে ও পড়তে ভালোবাসতেন। ছাত্র হিসাবে ভালো হলেও তিনি অংক ও বিজ্ঞানে খুব কাঁচা ছিলেন। যে কারণে হতাশায় ভুগতেন তিনি। নিজের বাবাকে খুশি করতে তাই তিনি জেলার বার্ষিক বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় নাম লেখালেন। সবাই ভাবল, আমার আব্বু পাগল হয়ে গেছেন। তার বন্ধ-ুবান্ধব ও শিক্ষকরা তাকে নিরস্ত করার চেষ্টা করলেন এবং দাদাও তাকে বক্তৃতা লিখে দিতে ইতস্তত করেন। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি আব্বুকে বক্তৃতাটি লিখে দেন। আব্বু বার বার সেই বক্তৃতা পাঠ করতে লাগলেন। বাড়িতে সুবিধা হত না তাই পাহাড়ে গিয়ে একা একা উচ্চৈস্বরে সেটা বলে বলে অভ্যাস করতে লাগলেন। আমাদের এলাকায় লোকজনের কাজকর্ম খুব কম তাই কোন একটা উপলক্ষ পেলেই সেখানে বিপুল জনসমাগম হয়। বিতর্ক উপলক্ষেও তাই হল। একে একে প্রতিযোগিরা বক্তৃতা দিতে লাগল। তাদের মধ্যে কয়েকজন ভালো বক্তা হিসাবেই পরিচিত। সেদিনের কথা বলতে গিয়ে আব্বু বলেন, ‘শেষে আমি গিয়ে মঞ্চে দাঁড়ালাম। হাত-পা কাঁপতে লাগল। তবে আমি খুব ছোট্ট ছিলাম। বক্তৃতার স্ট্যান্ড আমার চেয়ে অনেক উঁচু ফলে আমি তার আড়ালে পড়ে গেলাম। সামনে কাউকেই দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমার হাতের তালু ঘামছিল এবং আমার মুখ কাগজের মত সাদা হয়ে গিয়েছিল। সামনের কাগজে লেখা অক্ষরগুলো যেন ছোটাছুটি করতে লাগল। যাই হোক, আব্বু যখন বলতে শুরু করলেন, দেখা গেল, তাঁর কোন কথাই আটকাচ্ছে না। ঝর্ণাধারার মত অনর্গল বলে চললেন তিনি। দাদার মত বজ গম্ভীর কণ্ঠ তার ছিল না তবে আবেগ দিয়ে বলে চললেন তিনি। তাঁর বক্তব্য শেষ হতেই করতালিতে ফেটে পড়ল গোটা প্রেক্ষাগৃহ। দর্শকদের ভেতর বসা আমার দাদাও করতালি দিচ্ছিলেন খুশিতে। আব্বু বলেন, ‘এই একটা কাজ, যা দিয়ে আমি আমার বাবার মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছি।’ আব্বু সেদিন ফার্স্ট প্রাইজ নিয়ে ঘরে ফিরেছিলেন। এর পর থেকে আব্বু প্রতিটি বিতর্ক প্রতিযোগিতাতেই নাম দিতেন এবং পুরস্কার জিততেন। দাদা গর্বের সঙ্গে লোকের কাছে তার ছেলের এই কৃতিত্বের প্রশংসা করতেন।